বঙ্গবন্ধুর সরকার – কৃষি পুনর্বাসন ও ভূমি সংস্কার

কৃষি পুনর্বাসন ও ভূমি সংস্কার : বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে কৃষি থেকে। যুদ্ধে ধ্বংস এবং তার গুরুত্ব বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু পুনর্গঠনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গিয়েছিলেন কৃষকের কাছে। বেশ কতগুলো জটিল আইন সংস্কার করে প্রথম অবস্থা থেকেই আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তিনি।বঙ্গবন্ধুর সরকার - কৃষি পুনর্বাসন ও ভূমি সংস্কার

১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতীয়করণের নীতি ঘোষণা উপলক্ষে বেতার-টেলিভিশনে ভাষণদানকালে কৃষিব্যবস্থা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “আমাদের সমাজে চাষিরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণি এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্যে আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পিছনে নিয়োজিত করতে হবে।” কৃষির প্রতি বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য।

বঙ্গবন্ধুর সরকার – কৃষি পুনর্বাসন ও ভূমি সংস্কার:

১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত উদ্যোগ :

যুদ্ধ-পরবর্তী দেশে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং প্রতিবন্ধকতার মধ্যে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ পুনর্গঠনের যে কাজগুলো সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত খতিয়ান হলো:

  • ১৩ মাসের মধ্যে কৃষকদের মাঝে ১০ কোটি টাকার তাকাভী ঋণ বণ্টন;
  • ৫ কোটি টাকার সমবায় ঋণ বণ্টন;
  • ৮৩ হাজার টন সার সংগ্রহ এবং ৫০ হাজার টন বিতরণ;
  • ২ হাজার ১২৫ মণ বোরো ধানের বীজ সরবরাহ;
  • ৩ হাজার মণ গম বীজ বণ্টন;
  • ১ হাজার ৭০০ মণ আলু বীজ বণ্টন;
  • সেচের জন্য ৯৪টি গভীর নলকূপ বসানো;
  • ৩ ইঞ্চি ব্যাসের ১০০ অগভীর নলকূপ বসানো;
  • ২০ হাজার পাওয়ার পাম্প সরবরাহ;
  • ৮০ লাখ একর জমিতে সেচের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
  • ২১টি ট্রাক্টর সরবরাহ করা;
  • কলের লাঙল ২১টি সরবরাহ করা হয় নাম মাত্র মূল্যে;
  • ১ লাখ হালচাষের বলদ সরবরাহ করা হয় নাম মাত্র মূল্যে;
  • ৫০ হাজার দুগ্ধবতী গাভি সরবরাহ করা হয় ভর্তুকি মূল্যে;
  • রিলিফে ৪ হাজার ঢেঁকি দেওয়া;
  • ৫৩টি চাউল ও আটাকল স্থাপন এবং ২৯১টি পুনঃসংস্করণ করা হয়; এসব কাজ জরুরি ভিত্তিতে করার জন্য প্রায় ৯ হাজার নতুন লোককে চাকরিতে নিয়োগ করা হয়।

এছাড়াও জাতিসংঘের সহায়তায় ১০ লক্ষ বসতবাড়ি নির্মাণ ও সংস্কার এবং ৩০ কোটি টাকার রিলিফ বিতরণ বিশেষ করে খাদ্য বিতরণ একটানা তিন মাস ধরে চলে। সর্বমোট ৬৩ কোটি টাকা খরচ করে ৯৮টি সরকারি খাদ্যগুদাম ও থানা পর্যায়ে বিধ্বস্ত হাসপাতাল পুনঃনির্মাণ করা হয়। নারী পুনর্বাসন প্রকল্পে ২৭ কোটি টাকা খরচ করা হয়, প্রায় ৯৪ হাজার নারী পুনর্বাসিত হয়।

Sheikh Mujibur Rahman, the Prime Minster of Bangladesh, affixes his signature to the Constitution on November 1974
Sheikh Mujibur Rahman, the Prime Minster of Bangladesh, affixes his signature to the Constitution on November 1974

প্রথম বছরেই ৩০ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতির ২৬ লক্ষ টন খাদ্য সরবরাহ করা হয়েছিল। সারাদেশে ২ হাজার ৬০০ রেশন দোকানও খোলা হয়েছিল। রেশনে শতকরা ৫০ ভাগ ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই থেকে চাল ও গমে মণপ্রতি ১২ থেকে ১৫ টাকা সরকারি সহায়কী বা সাবসিডি দিয়ে ক্রেতা পর্যায়ে তার মূল্য মণপ্রতি যথাক্রমে ৪০ ও ৩০ টাকা নির্ধারণ করে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল ।

১৯৭২-৭৩ অর্থ বছরের বাজেটে কৃষিখাতে বরাদ্দ করা হয়েছিল ১০৩ কোটি টাকা। কৃষিখাতে বরাদ্দের এই মাত্রা তৎকালীন সময়ে দেশে সর্বকালের খতিয়ানে সবচেয়ে বেশি । যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করার পূর্বঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী এই বরাদ্দ করা হয়েছিল। এই বরাদ্দের তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল ১৯৭২-৭৩ অর্থ বছরে ১৫ লক্ষ একর থেকে ৩৬ লক্ষ একরকে উচ্চ উৎপাদনশীল খাদ্য উৎপাদনের আওতায় আনা।

৪ লক্ষ ২৫ হাজার টন রাসায়নিক সার সরবরাহ, ১২ হাজার টন কীটনাশক ঔষধ সরবরাহ, ৩৫ হাজার পাম্প স্থাপন, ২৪০০ গভীর নলকূপ ও ৪০০০ অগভীর নলকূপ খনন উক্ত বছরের লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কৃষকেরা যাতে সহজে রাসায়নিক সার লাভ করতে পারেন, সেজন্য এর মণপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০ টাকা। এই দাম ছিল সরকারের ক্রয়মূল্যের অর্ধেক।

সরকারের এই পদক্ষেপের কারণে উচ্চ ফলনশীল ধান ও গম চাষের একরভিত্তিক লক্ষমাত্রা অর্জিত হয়েছিল। একরের হিসাবে এই দুই ফসলের চাষ বেড়েছিল শতকরা ৭৫ ভাগ। ১৯৭২-৭৩ অর্থ বছরে ৩৫ হাজার শক্তিচালিত পাম্প স্থাপন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। তন্মধ্যে সরকার ৩২, ৭৫০টি পাম্প স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। ২ লক্ষ ৭৪ হাজার টন সার বিতরণ করা হয়েছিল। ইরি, উন্নতমানের পাট, গম ও আলুর বীজ যথেষ্ট পরিমাণে সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছিল।

১৯৭৩-৭৪ অর্থ বছরে মোট ৩৫,২৩৬টি শক্তিচালিত পাম্প অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যের চেয়ে ২৩৬টি বেশি পাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। এছাড়াও সরকার ১৪৯৫টি গভীর নলকূপ ও ১০০০ এরও বেশি অগভীর নলকূপ খনন করতে সমর্থ হয়েছিল। ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা তাকাভী ঋণ বণ্টন করা হয়েছিল। সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপে ১৯৭৩-৭৪ অর্থ বছরে পূর্ববর্তী বছরের উৎপাদনের তুলনায় আমন ফসলের উৎপাদন বেড়েছিল শতকরা ২০ ভাগ ও আউস ফসলের উৎপাদন বেড়েছিল শতকরা ২৩ ভাগ।

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে দেশে কৃষির উন্নয়নে যে পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা হয়েছিল এবং তা থেকে যে ফলাফল পাওয়া গিয়েছিল তার গুরুত্ব অনুধাবন করা যাবে যদি উক্ত সময়ের কর্মকাণ্ডের সাথে পরবর্তী সময়ের কর্মকাণ্ডের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা যায়। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু ক্ষমতা গ্রহণের ১৩ মাসের মাথায় কৃষকের মাঝে ১০ কোটি টাকা তাকাভী ঋণ এবং ৫ কোটি টাকা সমবায় ঋণ বিতরণ করেন।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

যে সময়ে দেশের বাজেটে বৃহৎ অংশ পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণের কাজে বরাদ্দ করতে হয়েছিল সেই সময়ও ১৫ কোটি টাকা কৃষি ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে সরকারের যে বাজেট ছিল তা যদি বর্তমান লক্ষ কোটি টাকার বাজেটের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে বর্তমানে কৃষকদের মাঝে ঋণ বিতরণ করা উচিত প্রায় ২০০০ কোটি টাকা। অথচ ২০০৫-২০০৬ অর্থ বছরে নীট ঋণ বিতরণ (বিতরণ বাদ আদায়) করা হয়েছে ১৩৩২ কোটি টাকা এবং ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছরে নীট ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৬১৬.৫১ কোটি টাকা ।

বর্তমানে কৃষি ঋণের সুদে ঋণ গ্রহণ করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এনজিও থেকেও ঋণ না পেয়ে কৃষক দারস্থ হচ্ছে মহাজনী ঋণ বা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে । দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করছে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা হারে সুদের বিনিময়ে । অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের টাকা যথাসময়ে পরিশোধ করতে না পারার কারণে কৃষকের ঘর-বাড়ি, গরু-ছাগল, গাছ পালা তুলে দিতে হচ্ছে দাদন ব্যবসায়ীদের হাতে।

কৃষি ক্ষেত্রে আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে সেচ। বঙ্গবন্ধু সরকার কৃষির উন্নয়নকল্পে ১৯৭৩ সালে পাওয়ার পাম্প স্থাপন করেছিলেন ২০০০০ এবং ৮০ লক্ষ একর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করেছিলেন । যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বঙ্গবন্ধু সরকার কৃষির জন্য সুষ্ঠু সেচের ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। নিম্নে ১৯৬৯-৭০ সাল থেকে ১৯৭৪-৭৫ সাল পর্যন্ত দেশে সেচকৃত জমির পরিমাণের তথ্য উপস্থাপন করা হলো:

সেচকৃত জমির পরিমাণ (একরে)

১৯৬৯-৭০ – ২৬,১৪,০৫০

১৯৭০-৭১ – ২৮,৮৩, ৯৫০

১৯৭১-৭২ – ২৫,৮৭,৩০০

১৯৭২-৭৩ – ২৯,৯২,৫০০

১৯৭৩-৭৪ – ৩২,০২, ২৫০

১৯৭৪-৭৫ – ৩৫,৬১,৪৭২

উপরের তালিকায় দেখা যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সমস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করে মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধু সরকার সাড়ে নয় লক্ষ একর অতিরিক্ত জমি অর্থাৎ ৩৬ শতাংশের বেশি সেচের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেচের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার যে পরিমাণ পাওয়ার পাম্প স্থাপন করেছিলেন তা দেশের কৃষি ক্ষেত্রে কতখানি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় যদি পরবর্তী আমলে স্থাপিত পাওয়ার পাম্পের সাথে তুলনা করা হয়।

যেমন পরবর্তীতে ১৯৯৩-১৯৯৪ সাল নাগাদ দেশে পাওয়ার পাম্প বসানো হয়েছিল ৮৭,৫০৫টি, অর্থাৎ পরবর্তী বিশ বছরে পাওয়ার পাম্প বসানো হয়েছিল ৬৭,৫০৫টি, প্রতি বছরে গড়ে ৩,৩৭৫টি। অর্থাৎ ১৯৭৫ পরবর্তী ২০ বছরে গড়ে যতগুলো পাওয়ার পাম্প বসানো হয়েছিল ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার বসিয়েছিলেন তার ছয় গুণ। এছাড়াও ১৯৭৫ সালে ১৮ এপ্রিল ফারাক্কা সংক্রান্ত অন্তবর্তীকালীন একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman with his colleagues
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman with his colleagues

বঙ্গবন্ধুর জোরালো ভূমিকার কারণেই চুক্তির শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যে এপ্রিল মে শুকনো মৌসুমে ভারত ১১,০০০ থেকে ১৬,০০০ কিউসেক পানি প্রত্যাহার করবে; কিন্তু বাংলাদেশ পাবে ৪৪,০০০ কিউসেক পানি। ফারাক্কা সংক্রান্ত এর চেয়ে ভালো বন্দোবস্ত পরবর্তীকালের কোনো প্রশাসনই উপহার দিতে পারেনি। কৃষি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকারের এই পদক্ষেপ বা সাফল্য বাংলার ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, সেচ কৃষির অন্যতম একটি উপকরণ।

পর্যাপ্ত সেচ ব্যতীত ফসল উৎপাদন সম্ভব নয় এবং প্রয়োজনীয় বাঁধের অভাবে বর্ষা মৌসুমে ফসলের অনেক ক্ষতি হয়। বঙ্গবন্ধু সরকার কর্তৃক কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সেচ নিশ্চিত করার জন্য যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছিলেন তা কতখানি উল্লেখযোগ্য সেটি অনুধাবন করা যায় স্বাধীনতার ৩৪ বছর পরেও যখন দেশে সেচ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রতিকূল অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ-পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হলো।

খালিয়াজুরীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ না থাকায় প্রতি বছর ২০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ জেলার কাছাকাছি পাঁচটি উপজেলার পাশ দিয়ে প্রবাহিত ধনু নদীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মিত না হওয়ায় প্রতি বছর ৫টি উপজেলার ২০ হাজার হেক্টর জমিতে উঠতি বোরো ধান আগাম বন্যার পানিতে বিনষ্ট হয়। ১৯৯৪ সালে দুইটি সংস্থা বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে জরিপ চালায় এবং প্রকল্পটি পানি উন্নয়ন বোর্ড হাতে নেয়।

প্রায় ১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেলে ৮৩ কিলোমিটার পুনঃখনন বাঁধে ১৬টি রেগুলেটর নির্মাণ, ১৬টি ইনলেট, ১৫টি পাইপ সুইস নির্মাণ, ২ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদীর তীর সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। ২০০৩ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পের বাঁধ নির্মাণের জন্য ৬৬ লাখ টাকার টেন্ডার আহ্বান করেও পরে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়।

শুধু অর্থ বরাদ্দের অভাবে বাঁধ নির্মাণ করতে না পারার কারণেই নয় প্রশাসনের ভুল সিদ্ধান্তেও কীর্তনখোলা খালের মুখ বন্ধ না করায় আগাম বর্ষণে ধনু নদী দিয়ে আগাম বর্ষণের পানি ফসলের জমিতে প্রবেশ করায় খালিয়াজুরিতে ২০ হাজার বোরো ফসল তলিয়ে যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, অবশেষে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বড় দাঁড়া একটি বিশাল প্রাকৃতিক ক্যানেল। ১৯৮০ সালে বড় দাঁড়ার ওপর একটি সুইসগেট নির্মাণের পরিকল্পনা অর্ধেক বাস্তবায়নের পর আজ পর্যন্ত এই কাজে আর হাত দেওয়া হয়নি। ফলে হাজার হাজার বিঘা জমি জলসেচ আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার গোপাল ইউনিয়নের মধ্যদিয়ে গত ১৫ বছর আগে পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া ক্যানেল খনন করে। প্রতি বর্ষা মৌসুমে ভারি বর্ষণ ও প্রবল স্রোতে ক্যানেলের দুই ধারে বাঁধের অসংখ্য স্থান ভেঙে যায়। কর্তৃপক্ষ ভাঙা বাঁধ মেরামতে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় এসব অঞ্চলের আবাদ আকস্মিকভাবে মার খায়।

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পাঁচ বছরে তিনবার ফসল ডুবিতে সরকারি হিসাবেই প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ফসল ডুবির ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি হাওরসমৃদ্ধ জেলা সুনামগঞ্জের ফসলি বোরো চাষাবাদের ওপর কৃষকদের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। সহস্রাধিক হাওরের মধ্যে বৃহৎ ৫২টি হাওর বোরো ফসলের জন্য বিখ্যাত। এই ৫২টির মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২৮টি হাওরের ফসল রক্ষায় প্রতি বছর এক হাজার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বেড়িবাঁধ অস্থায়ীভাবে নির্মাণ করে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণ কাজের উপর হাওরের ফসল রক্ষার বিষয়টি ঝুলে থাকে। অভিযোগ রয়েছে বাঁধ নির্মাণ কাজে কৃষকের মতামত উপেক্ষা করে কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের মনগড়া পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ায় পাহাড়ি ঢলের তোড়ে বাঁধ ভেঙে ফসলডুবি ঘটে। প্রতিবারই পাউবোর কোটি টাকার বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম থাকায় শত কোটি টাকার ফসলডুবিতে হাওরের কৃষকদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এসবের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শাস্তিমূলক বদলি ছাড়া দৃষ্টান্তমূলক কিছু হয় না।

উপরোক্ত বর্ণনার প্রেক্ষিতে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরেও দেশে কৃষির জন্য সেচ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের যদি অবস্থা এই হয় সেই দেশে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থায় কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেচসহ কৃষির অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছিলেন তা কেবল অর্থনীতি সচেতন দেশপ্রেমিক নেতার পক্ষেই সম্ভব ছিল। কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বঙ্গবন্ধু সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপই গ্রহণ করেছিলেন না, তাঁর পদক্ষেপে জাতীয় আয়ে কৃষির অবদান উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

নিম্নের তালিকায় তা প্রকাশ করা হলো :

বছর — স্থির মূল্যে কৃষি খাতের আয় (ভিত্তি বছর ১৯৭২-৭৩) — প্রবৃদ্ধির হার

১৯৭২-৭৩ – ২৩২৩ কোটি টাকা —-

১৯৭৩-৭৪ – ২৫৯৫ কোটি টাকা — ১১.৭১%

১৯৭৪-৭৫ – ২৪৪১ কোটি টাকা —- (৫.৯৬%)

উপরের তালিকা অনুযায়ী ১৯৭২-৭৩ সালের তুলনায় ১৯৭৩-৭৪ সালে স্থির মূল্যে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১১.৭১% এবং ১৯৭৪-৭৫ সালে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয় ৫.৯৬%। ১৯৭৪-৭৫ সালে পর পর তিনবার বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতির কারণে কৃষির প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হলেও ১৯৭২-৭৫ সময়কালে সার্বিকভাবে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২.৫০% ।

সুতরাং দেশ স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ১৯৭৪-৭৫ অর্থ বছর পর্যন্ত কৃষির প্রবৃদ্ধির হারের সাথে ১৯৭৫-৭৬ অর্থ বছর থেকে বর্তমান ২০০৮-০৯ অর্থ বছরের (৩৩ বছরের) গড় প্রবৃদ্ধি তুলনা করলে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়কালে কৃষির গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২.৫০% পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধু সরকার পরবর্তী ৩৩ বছরে কৃষির গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২%-এর কম। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির এই তুলনামূলক চিত্রটি তালিকা-১-এ সংযুক্ত করা হলো।

উক্ত সংযুক্তি অনুযায়ী আরও যেটি লক্ষ্য করা যায় তা হলো- বঙ্গবন্ধু সরকারের সময়কালে কৃষিতে যে হারে প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল ১৯৭৪-৭৫ পরবর্তী সময়কালে যদি সেই হারে কৃষির প্রবৃদ্ধি ঘটত তাহলে মুদ্রাস্ফীতিসহ ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে জাতীয় আয়ে কৃষি খাতে আয়ের পরিমাণ থাকত ১,০৫,২৩৫ কোটি টাকা, কিন্তু সেটি না হয়ে ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে জাতীয় আয়ে কৃষি খাতে আয়ের পরিমাণ হয়েছে ৮৮,৬০১ কোটি টাকা অর্থাৎ সম্ভাব্য (যদি গড় ২.৫০% হারে প্রবৃদ্ধি হতো) আয়ের ৮৪%।Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman 24 বঙ্গবন্ধুর সরকার - কৃষি পুনর্বাসন ও ভূমি সংস্কার

বিগত ৩৩ বছরে কৃষির আধুনিকায়ন, বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন গবেষণা করে কৃষির যে উন্নতি সাধন করা হয়েছে সে উন্নতি বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রবৃদ্ধির হারকে অতিক্রম করতে পারেনি। এটিই প্রমাণ করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন কাজ সম্পন্ন করে দেশে খাদ্যঘাটতি দূর করার বিষয়টিকে বঙ্গবন্ধু সরকার কতখানি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সুতরাং আরও একবার বলা বাহুল্য, কৃষি ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকারের এই সাফল্য বাংলার ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কৃষি ক্ষেত্রে ভূমি সংস্কার ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ । বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় যে, ভূমি সংস্কারের বিভিন্ন চিন্তা-ভাবনা বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত হয়েছে। কিছু কিছু কার্যক্রম অনেক সময়ে গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আদৌ সম্ভব হয়নি । আমাদের জাতীয় আয়ের সিংহ ভাগ কৃষি প্রদান করে অথচ সেই কৃষি ব্যবস্থা যদি ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকে তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে এটাই স্বাভাবিক।

এ লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার ৯৮ অধ্যাদেশের মাধ্যমে ভূমি সংস্কারের আমূল পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেন। ভূমি সংস্কার সম্পর্কিত বঙ্গবন্ধু সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের সংক্ষিপ্ত বিবরণ হলো :

ভূমি সংস্কার পদক্ষেপ:

১. দেশের জমি মালিকানার ক্ষেত্রে যে অসম বণ্টন রয়েছে তা প্রতিরোধ করার জন্য জমির সর্বোচ্চ সিলিং ১০০ বিঘা নির্ধারণ করা হয়। তবে বাগান, রাবার বাগান, সমবায় চাষ ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই সীমা শিথিলযোগ্য হবে।

২. ১০০ বিঘার অতিরিক্ত জমি অধ্যাদেশ জারির (১৫/০৭/১৯৭২) ৬০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে।

৩. উদ্বৃত্ত জমি সরকার নিজ হস্তে দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের (১.৫ একরের কম) মধ্যে বণ্টন করবে। বণ্টনের পর যাতে ১.৫ একরের বেশি জমি হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে।

৪. ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা ১৪ এপ্রিল ১৯৭২ থেকে মওকুফ করা হয়। ৫. ১৪ এপ্রিল ১৯৭২ পর্যন্ত সকল বকেয়া খাজনা মওকুফ করা হয়।

৬. সরকার ইজারাদারি প্রথা বিলুপ্ত করেন। অকৃষকদের কৃষি থেকে সরিয়ে আনতে চেষ্টা করে।

৭. ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয় স্থাপন করা হয়।

৮. সেলামী ছাড়া জমি বণ্টনের ব্যবস্থা করা।

৯. চর সম্পত্তির মালিক সরকার হবেন। নতুন কোনো চর উঠলে ঐ চরের মালিক সরকার হবেন। ঐ সমস্ত জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।

এক জরিপে দেখা যায় তৎকালীন সময়ে মোট জনসংখ্যার ১.৬৭ ভাগ ধনীক সম্প্রদায় ৫০.৬৫ ভাগ জমির মালিক ছিল। অথচ ২৫.১৭ ভাগ জমির মালিক ছিল ৭৭.৬৭ ভাগ দরিদ্র কৃষক। জমির মালিকানার এই চরম বৈষম্যে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিন্তা ছিল বঙ্গবন্ধুর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

আরও পড়ুন:

বঙ্গবন্ধুর সরকার

“বঙ্গবন্ধুর সরকার – কৃষি পুনর্বাসন ও ভূমি সংস্কার”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন