বঙ্গবন্ধুর সরকার – প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা

বঙ্গবন্ধুর সরকার – প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা – স্বাধীন দেশে নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর কাঁধে এসে চেপেছিল একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি সেদিন অর্থনীতির মৌলিক চাহিদা ছিল পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন। এর মধ্যে নতুন সরকারের নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য রাজনীতিবিদদের মধ্যে সোচ্চার কণ্ঠ ধ্বনিত হয়েছিল। এরই ফলশ্রুতে এবং দেশে বিরাজমান হতাশা, অভাব অনটন ও বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে দেশের শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদগণের সক্রিয় সহায়তা নিয়ে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন, শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই একটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা

প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা

পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান এবং তিনজন সদস্য ছাড়া দেশের বেশ কয়েকজন খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও উচ্চ শিক্ষিত আমলার কঠোর পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ১৯৭৩-৭৮ প্রণয়ন সম্ভব হয়। জাতির জনক পরিকল্পনাটির মুখবন্ধে একে ‘A plan for reconstruction and development of the economy taking into account the inescapable political, social and economic realities of Bangladesh’ বলে অভিহিত করেন। প্রথম পঞ্চবার্ষিকীর পরিকল্পনার মূল লক্ষ্যগুলো হলো:

→ কর্মহীন বেকার ও অর্ধবেকারদের কর্মসংস্থান তথা আয় রোজগার নিশ্চিত করা।

→ জাতীয় আয়ের দ্রুত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য নিবারণ ।

→ জাতীয় পুনর্গঠনের কাজ অব্যাহত রাখা ।

→ বার্ষিক ন্যূনতম সাড়ে পাঁচ ভাগ হারে Gross Domestic Product (GDP) বৃদ্ধি ।

→ জনসাধারণের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে তাল মেলাতে সক্ষম এমনি হারে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ বর্ধন।

→ সাধারণভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির হার স্থিতিশীল রাখা।

→ ফি বছর ন্যূনতম ২.৫ ভাগ হারে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করা।

→ সমাজতান্ত্রিক বিবর্তনের ধারা অব্যাহত রাখা।

→ বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমানো।

→ কৃষি ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য রূপান্তরের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ।

→ শহরগামী স্রোত বন্ধ করা ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ।

→ দ্রুত উন্নয়নের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ ও পরিকল্পিত জনসংখ্যা নীতির প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন ও সামাজিক অঙ্গীকার আনা।

→ অবহেলিত মানবসম্পদ ও মানবকল্যাণে উন্নয়ন ব্যয়ের দ্রুত সম্প্রসারণ এবং শ্রমের যথোপযুক্ত ও দক্ষ বিনিয়োগ তথা শ্রমের চলমানতা নিশ্চিত করে কর্মসংস্থান ও আয়ের সুষম বণ্টন করা ।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে পাকিস্তান ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্যের দেশ। পূর্ব বাংলার জনসংখ্যার হার ছিল ৫৬% এবং শিক্ষার হার ছিল ২১.৫%। পশ্চিম পাকিস্তানে জনসংখ্যার হার ছিল ৪৪% এবং শিক্ষার হার ছিল ১৬.৩% । পূর্ব বাংলার জনসংখ্যা এবং শিক্ষিত জনসংখ্যার হার পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে বেশি হওয়া সত্ত্বেও ১৯৫৫ সালের পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে নিয়োজিত অফিসার সংখ্যা (সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী) পূর্ব বাংলার ছিল মাত্র ৩% এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল ৯৭% এবং ১৯৫৫ সালে সরকারি উচ্চ পদের (সচিব, যুগ্মসচিব, উপসচিব ও সহসচিব পদে) পূর্ব বাংলার ছিল ৭% এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ছিল ৯৩%।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

চাকরিতে এমন চরম বৈষম্য সংগত কারণেই বাংলাদেশে বেকার সমস্যা ছিল একটি অন্যতম সমস্যা। এই সমস্যাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়, যা ছিল অত্যন্ত যুক্তিসংগত এবং সময়োপযোগী। দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, GDP এর গ্রোথ, উৎপাদন বৃদ্ধি এগুলোর কোন বিকল্প নেই তাই এগুলো বৃদ্ধি ছিল প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য। স্বাধীনতা সংগ্রামের নয় মাসে দেশের অবকাঠামোর কতখানি ক্ষতি হয়েছে তার বিস্তারিত পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামোর পুনর্গঠন ছিল প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার একটি অন্যতম লক্ষ্য।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাটি ছিল সমসাময়িক এবং একটি উৎকৃষ্ট উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক দলিল। এটি তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল একমাত্র বিচক্ষণ দূরদর্শী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সরকারের পক্ষেই। এই প্রসঙ্গে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তা হলো, বঙ্গবন্ধু সরকার প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করলেও তা বাস্তবায়নের সময় পেয়েছিলেন মাত্র দুই বছর। বাকি তিন বছর এটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়েছিল অন্য সরকারের হাতে।

এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে সাফল্য-ব্যর্থতার মূল্যায়নে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বাস্তবায়নে ব্যর্থতার পাল্লাই ছিল ভারি। কিন্তু কেন এই ব্যর্থতা? বছর ভিত্তিক যদি কিছুটা বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল ১৯৭৫ পরবর্তী সরকারের অদক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। উদাহরণস্বরূপ প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করা এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বঙ্গবন্ধু সরকার ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।বঙ্গবন্ধুর সরকার - কৃষি পুনর্বাসন ও ভূমি সংস্কার

যার বিস্তারিত বিবরণ “মুদ্রাস্ফীতি রোধে পদক্ষেপ” শীর্ষক অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে উক্ত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ১৯৭৫ সালের শেষের দিকে দ্রব্যমূল্য হ্রাস পেলেও পরিকল্পনার শেষ দিকে দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছিল পরিকল্পনা শেষে খাদ্যশস্য ছাড়া অন্যান্য ভোগ্যদ্রব্যের মূল্য ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে । এই পরিকল্পনার আর একটি উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করা।

এই প্রেক্ষিতে লক্ষ্য করা যায় ১৯৭৩-৭৪ সালে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতার পরিমাণ ছিল শতকরা ৬২ ভাগ। কিন্তু পরিকল্পনা শেষে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়ে শতকরা ৭৭ ভাগে উন্নীত হয়। জাতীয় সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার প্রথম বছরে অর্থাৎ ১৯৭৩ ৭৪ সালে মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ৪.৩ ভাগ সঞ্চিত হবে এবং পরিকল্পনার শেষ বছরে অর্থাৎ ১৯৭৭-৭৮ সালে সঞ্চয়ের পরিমাণ মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ১৪.২ ভাগে উন্নীত হবে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত ১৯৭৩-৭৪ সালের সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা ২.৫৮ ভাগ অর্থাৎ পরিকল্পনার শতকরা ৬০ ভাগ অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। পক্ষান্তরে, ১৯৭৭-৭৮ সালে সঞ্চয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে শতকরা ৩.১০ ভাগ অর্থাৎ পরিকল্পনার শতকরা ২২ ভাগ অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল । অনুরূপভাবে পরিকল্পনার প্রথমদিকে দ্রব্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও শেষে গিয়ে তা আবার হ্রাস পায় ।

আরও পড়ুন:

বঙ্গবন্ধুর সরকার

“বঙ্গবন্ধুর সরকার – প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন