বঙ্গবন্ধুর সরকার – পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন

পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন – বঙ্গবন্ধুর সরকার : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পরিবহন এবং যোগাযোগের রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। মুক্তি সংগ্রামের কালে আমাদের অনুন্নত যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সর্বাধিক। রেলপথ ব্যবস্থা সম্পর্কে একথা অধিকতর প্রযোজ্য। দুটো বড় রেলসেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তর এবং দেশের একস্থান থেকে অপর স্থানে মালপত্রের চলাচল গুরুতরভাবে ব্যাহত হয়।

বঙ্গবন্ধুর সরকার - পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

বঙ্গবন্ধুর সরকার – পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পুনর্নির্মাণ এবং পুনর্গঠন যেখানে অপরিহার্য সেখানে বঙ্গবন্ধু সরকারের সময় দেশে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে রেললাইন স্থাপন করা হয়েছিল ৩০ মাইল, ৩টি রেলইঞ্জিন মেরামত ও নতুন রেলইঞ্জিন আমদানি করা হয়েছিল ২টি এবং রেলবগি আমদানি করা হয়েছিল ৭৫টি, রেলবগি সংস্কার করা হয়েছিল ৭০টি।

এছাড়াও আমদানি করা হয়েছিল ৭৫টি আন্তঃজেলা বাস। ঢাকা শহর বাস ২০টি, ৯৯টি খাদ্যশস্য বহনকারী ট্রাক, ৪০৩টি কার্গো ইঞ্জিন এবং ১৮টি অয়েল ট্যাংক লরি । ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম ও লালমনিরহাটের রেলওয়ার্কশপ পুনঃসংস্কার ছিল তৎকালীন সরকারের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ।

পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধনে রেলের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকারের এই পদক্ষেপ কতখানি বলিষ্ঠ ছিল তা অনুমান করা সম্ভব যদি দেশের রেলের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ের তথ্যগুলোর সাথে তা তুলনা করা যায়। যেমন ১৯৭৫-৭৬ অর্থ বছর থেকে ২০০৮-২০০৯ অর্থ বছর পর্যন্ত ৩৩ বছরে মোট নতুন রেলপথ স্থাপন করা হয়েছিল ৬৫৫ মাইল (১০৪৯ কিলোমিটার) । অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে নতুন রেলপথ স্থাপন করা হয়েছিল ২০ মাইল অথচ বঙ্গবন্ধু সরকার এক বছরেই স্থাপন করেছিল ৩০ মাইল। রেলইঞ্জিনের ক্ষেত্রে ১৯৭৫ পরবর্তী তথ্য হলো বাষ্প এবং ডিজেলসহ মোট ইঞ্জিন ছিল ৪৫০টি অথচ ২০০৮-২০০৯ সালে সেই ইঞ্জিনের পরিমাণ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ২৮৩টি।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman with his colleagues
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman with his colleagues

অনুরূপভাবে ওয়াগনের ক্ষেত্রে ১৯৭৫-৭৬ সালে যেখানে মোট ওয়াগনের পরিমাণ ছিল ১৬,৮০২টি, ২০০৮-০৯ সালে সেই ওয়াগনের পরিমাণ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৯,৪০৯টি। স্বাধীনতা লাভের দেড় বছরের মাথায় সরকার আকাশ পথে পরিবহনের জন্য বিমান সংস্থার জন্য ৬টি এফ-২৭ বিমান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। একটি বোয়িং ৭০৭ বিমান সংগ্রহ করার জন্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

সিলেটে জেট অবতরণ উপযোগী একটি বিমান বন্দর এবং সৈয়দপুরে ও বরিশালে দুটি বিমান বন্দর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ঢাকা-লন্ডন ফ্লাইটও চালু হয়ে যায় ১৯৭৩ সালের ১৮ জুন। এছাড়া বিধ্বস্ত ও নিমজ্জিত নৌযানসমূহ অপসারণ করে এবং সম্পূর্ণ মাইন মুক্ত করে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দরকে পূর্ণ কার্যক্ষম করা সম্ভব হয়েছিল।

অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ক্ষেত্রে আটটি উপকূলীয় জাহাজ, পাঁচটি স্বয়ং চালিত বার্জ, নয়টি তৈল-ট্যাংকার এবং ১৭টি সমুদ্রগামী বার্জ ও কয়েকটি ট্যাগ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। ১৯৭৩-৭৪ অর্থ-বছরে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের জন্য ৭টি সমুদ্রগামী জাহাজ সংগ্রহ করা হয়েছিল যা দিয়ে কর্পোরেশনের বহনক্ষমতা দাঁড়িয়েছিল ১ লক্ষ ১০ হাজার ২৮৩ টন।

পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে বঙ্গবন্ধু সরকারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল পাকা ব্রিজ তৈরি। ১৯৭৩ সালে দেশে পাকা ব্রিজ নির্মাণ ও পুননির্মাণ হয়েছিল ২৩০টি, যা ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা, ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরেই ভৈরব ব্রিজ নির্মিত হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২-৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুই প্রথম তদানীত্তন জাপান সরকারের কাছে যমুনা সেতু নির্মাণের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেন, ফলে একটি জাপানি বিশেষজ্ঞ দল ঐ সময়ে বাংলাদেশ সফর করে যমুনা সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করে। সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা ছাড়া শিল্পের বিকাশ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার সম্ভব নয়।

একথা সত্য যে, বঙ্গবন্ধু সরকার পরবর্তী ৩৩ বছরে দেশে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৭৪-৭৫ অর্থ-বছর পর্যন্ত জাতীয় আয়ে পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাখাতে প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল শতকরা ৩ ভাগ। পরবর্তী সময়ে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ৮.৫ ভাগ। তবে উন্নতি যাই হোক না কেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে রেলওয়ের অবস্থা কি হয়েছে তা কারো অজানা নয়। তবুও রেলওয়ের অবস্থা অনুধাবন করার জন্য একটি বিষয় নিম্নে উল্লেখ করা হলো।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ২০০৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ১০ মাসে নোয়াখালি লাকসাম ৫০ কিলোমিটার রেললাইনের বিভিন্ন স্থানে ৪০টি রেলদুর্ঘটনা ঘটলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ অধিকাংশ লাইন ঠিক নয়, বেশির ভাগ স্লিপার অকেজো এবং নাট-বল্টু নেই। দীর্ঘ ৪০ বছরের পুরানো স্লিপারের সংস্কার না করায় এবং প্রয়োজনীয় নুড়ি-পাথর না থাকায় সম্পূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে এ পথে ট্রেন চলাচল করছে। লাইনে ত্রুটির কারণে ঘণ্টায় মাত্র ১৫ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চালাতে হয় ফলে যাত্রীরা রেলপথে যাতায়াত প্রায় বন্ধই করে দিয়েছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ৩২ বছর পর (২০০৩ সাল) যখন দেশে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়, সেই সময় যদি রেলের অবস্থা এরকম দেখা যায় সে ক্ষেত্রে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে রেলের অবস্থা কি হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। অথচ সেই সময় ৩০ মাইল রেললাইন স্থাপন, রেলইঞ্জিন, বাস আমদানি এবং সংস্কার, রেলব্রিজ পুনর্নির্মাণ, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ সংস্কার এসবই সম্ভব হয়েছিল এ দেশের দুঃখী মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু সরকারের পক্ষেই।

টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকারের সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু প্রথম যেদিন টেলিফোনের রিসিভার হাতে তুলেছিলেন, সেদিন ঢাকা জেলা থেকে মাত্র তিনটি জেলার সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল, অন্যান্য জেলাগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন । এমনি অবস্থা থেকে সারাদেশে টেলিযোগাযোগের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করা হয় এবং মাত্র তিন বছরের মাথায় ১৪ জুন, ১৯৭৫ বঙ্গবন্ধু বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্র উদ্বোধন করেন।

আরও পড়ুন:

বঙ্গবন্ধু সরকারের সকল উদ্যোগ সম্পর্কে পড়ুন

“বঙ্গবন্ধুর সরকার – পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন