বঙ্গবন্ধুর সরকার

বঙ্গবন্ধুর সরকার : মুক্তিযুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ, পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করে দিয়ে যাওয়া একটি দেশের দায়িত্ব নেন তিনি। বিধ্বস্ত অবকাঠামো, শূন্য অর্থ এবং স্বাধীন দেশের কাছে সবার বেশুমার প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হয় তার যাত্রা। তাই আজকের বাস্তবতায় দাড়িয়ে সেই সময়ের সিদ্ধান্তগুলোকে বিচার করা যাবে না। সেই সময়ের সিদ্ধান্তগুলো বুঝতে হলে সেই সময়ের বাস্তবতার নিরিখে বুঝতে হবে।

বঙ্গবন্ধুর সরকার, Sheikh Mujibur Rahman, the Prime Minster of Bangladesh, affixes his signature to the Constitution on November 1974
Sheikh Mujibur Rahman, the Prime Minster of Bangladesh, affixes his signature to the Constitution on November 1974

বঙ্গবন্ধুর সরকার

আমরা বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময়ের আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং সেই পরিস্থিতিতে নেয়া সিদ্ধান্তগুলো একত্রিত করার একটা চেষ্টা করছি। আশা করি নতুন প্রজন্মের পক্ষে সেই সময়টি উপলব্ধি করে বিষয়টি বোঝা সহজ হবে।

স্বাধীনতা লাভ ও যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি:

১৯৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের মধ্যদিয়ে এই বাংলা চলে যায় ব্রিটিশের শাসনে। প্রায় ২০০ বছর চলে ব্রিটিশের শাসন ও শোষণ। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান স্বাধীন হলেও পূর্ব বাংলা পরিগণিত হয় পাকিস্তানের উপনিবেশ হিসেবে উপনিবেশ হিসেবে পূর্ব বাংলার জনগণ প্রতি ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হয়। ব্রিটিশের শোষণ আর পাকিস্তানি উপনিবেশবাদ চলাকালে জন্ম হয় অসংখ্য জ্ঞানীগুণী, মনীষী ও প্রতিভাবান রাজনীতিবিদের । তাঁদেরই একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

ফরিদপুরের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম বাংলার আর দশটি গ্রামের মতো এখানেও বিরাজ করতো শোষণ, নির্যাতন, অনাহার, মহামারি ইত্যাদি। কুসংস্কার ছিল সর্বব্যাপী। দিগন্তবিস্তৃত মাঠে ফসলের সমারোহে চোখ জুড়িয়ে গেলেও যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তা উৎপাদন করত, তাদের পেটে জ্বলতো ক্ষুধার আগুন কারণ এই ফসল কৃষকের ঘরে যেতো না, যেতো জোতদারের গোলায় ‘ছায়া সুনিবিড়’ এই গ্রামগুলো মোটেই ‘শান্তির নীড়’ ছিল না। এখানকার ৯৫ ভাগ মানুষের নিত্যসহচর ছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মন্বন্তর ইত্যাদি।

এহেন পরিবেশেই শেখ সাহেবের জন্ম। এ সময়ের স্মৃতি প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “সে সময়েই আমি গ্রাম থেকে অভাব ও দারিদ্র্য দূর করার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম।” শৈশব থেকেই শেখ মুজিব ছিলেন নির্ভীক, সাহসী ও দুর্বার। স্কুলজীবন থেকেই তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শিখেছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক তৎপরতার কোনো বিরতি বা ছেদ ছিল না।

  • ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন ও ছাত্রলীগ গঠন
  • ১৯৪৯ সালের আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন ও খাদ্যের দাবিতে ঢাকায় ভুখা মিছিলের আয়োজন
  • ১৯৫১ সালে পাকিস্তান গণতন্ত্রের খসড়া মূলনীতির বিরোধিতা
  • ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে কারাগারে অনশন
  • ১৯৫৩ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠন
  • ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার বিজয় এবং আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ
  • ১৯৫৬ সালে স্বায়ত্তশাসনের দাবি ও সাংবিধানিক সংখ্যাসাম্যের বিরোধিতা
  • ১৯৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা
  • ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে কারাবাস
  • ১৯৬২ সালে আইয়ুবি সংবিধানের বিরোধিতা এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট থেকে পদত্যাগ
  • ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লেিগর পুনরুজ্জীবন
  • ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের অনিরাপত্তাজনিত অবস্থার পর্যবেক্ষণ
  • ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবির প্রস্তাব
  • ১৯৬৮ সালে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলায় এক নম্বর আসামি
  • ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহার
  • ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার সংগ্রাম।

বঙ্গবন্ধুর ২৩ বছরের এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলে ছিল দুঃখী মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘব করার অক্লান্ত প্রচেষ্টা। যে কারণে এই সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন তা হলো দুঃখী মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ।

পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দুই প্রদেশের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য । পশ্চিম পাকিস্তান এবং পূর্ব পাকিস্তানের গড় আয়ের ব্যাপক পার্থক্য। ১৯৫৯-৬০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু গড় আয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের গড় আয়ের চেয়ে ৩২% বেশি। পরবর্তী ১০ বছরে পশ্চিম পাকিস্তানের আয়ের বৃদ্ধির হার ছিল ৬.২% যেখানে পূর্ব পাকিস্তানে তা ছিল ৪.২%। ফলে ১৯৬৯-৭০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মাথাপিছু গড় আয় পূর্ব পাকিস্তানের গড় আয়ের চেয়ে ৬১% বেশি দাঁড়ায়।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

দেশের মোট বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ এবং বৈদেশিক সাহায্য অবৈধভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে উপেক্ষা করে পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যবহার করা হতো। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের পণ্য রপ্তানি করে যে বৈদেশিক আয় অর্জিত হতো তা ব্যবহার করা হতো পশ্চিম পাকিস্তানিদের জন্য পণ্য আমদানির কাজে । পাকিস্তানের অর্থনৈতিক নীতি বিশেষ করে আমদানিনীতি এবং শিল্পায়ন এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে পশ্চিম পাকিস্তানের স্বল্প মূল্যে আমদানি করা পণ্য অধিক মূল্যে ক্রয় করতে হয়।

১৯৫০-৫১ থেকে ১৯৫৪-৫৫ পর্যন্ত ৬০% জনগণ অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য উন্নয়ন ব্যয়ের মাত্র ২০% বরাদ্দ করা হতো। উক্ত বৈষম্য থেকে জাতিকে রক্ষা করার লক্ষ্যেই বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কনভেনশনে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি পেশ করেন। প্রস্তাবিত ছয় দফা দাবি ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ। এই ছয় দফা দাবির তিনটি (তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম দফা) অর্থনৈতিক বিভিন্ন প্রস্তাব যেগুলো ছিল নিম্নরূপ:

তৃতীয় দফা :

যদি এমন ব্যবস্থা উদ্ভাবন ও প্রবর্তন করা যায় যাতে দেশের এক অংশ থেকে অন্য অংশে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে বা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে পুঁজি পাচার রোধ নিশ্চিত করা যাবে, তবে সারা দেশের জন্য একই মুদ্রা থাকবে। অন্যথায় (পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য) দুটি আলাদা মুদ্রার ব্যবস্থা করা হবে।

চতুর্থ দফা :

কর নির্ধারণ ও আদায় অঙ্গরাজ্যসমূহের এখতিয়ারে থাকবে। ফেডারেল সরকারকে নির্ধারিত অর্থ দেয়া হবে। অঙ্গরাজ্য দুটি আলাদা আলাদা বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক সাহায্য নিয়ন্ত্রণ করবে।

পঞ্চম দফা :

আইয়ুব খান ও তার পশ্চিম পাকিস্তানি সহযোগীরা ছয় দফাকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রস্তাব ও দেশকে ধ্বংস করার চক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করেন । মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধুকে অন্তরীণ করা হয় এবং আগরতলা মামলায় জড়ানো হয় । আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকেও নিরাপত্তা আইনে আটক করা হয় । ছয় দফা এবং শেখ মুজিব ও তার সহযোগীদের ধ্বংস করতে গিয়ে আইয়ুব খান ও তার দোসররা ছয় দফাকে শীঘ্রই এক দফায় অর্থাৎ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপান্তরকে করে তোলেন অনিবার্য।

আর বঙ্গবন্ধু অধিষ্ঠিত হন বাঙালির এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের একচ্ছত্র নেতৃত্বে । আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে ১৯৬৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিক্রিয়া এত তীব্র হয় যে, ঢাকা তো বটেই সারা পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আগুন জ্বলে ওঠে। আইয়ুব খান আগরতলা মামলা তুলে নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন এবং এর কিছুদিন পর ১৯৬৯ এর মার্চে সেনা প্রধান ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে বিদায় দেন।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

ইয়াহিয়া খান ১৯৭০-এর ডিসেম্বরে নির্বাচন দেন। এদিকে নির্বাচনের আগের মাসে অর্থাৎ নভেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়ের পর ত্রাণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় সরকারের সীমাহীন উদাসীনতা ও অবহেলা চরম ঘা দেয় বাঙালি চেতনায়। ছয় দফার যৌক্তিকতা আবারো প্রমাণিত হলো, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে যোগ হলো নতুন মাত্রা।

বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বাংলার মানুষের কাছে গৃহীত হলো তাদের মুক্তি সনদ রূপে । নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের আশি ভাগের বেশি ভোটার রায় দেন ছয় দফার পক্ষে । আওয়ামী লীগের এই বিপুল বিজয় নিঃসন্দেহে প্রমাণ করলো ছয় দফার জনপ্রিয়তা। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাননি বঙ্গবন্ধু । কোনো ভয়ভীতি, প্রলোভন, ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা বিচ্যুত করতে পারেনি তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে।

হাজার বছরের ইতিহাসের পথ-পরিক্রমায় বাঙালি জাতি এসে দাঁড়িয়েছিল এক ঐতিহাসিক যুগসন্ধিক্ষণে। আসন্ন হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের পট পরিবর্তন। এক হয়ে গিয়েছিল নেতা ও জনতার স্বপ্ন, উদ্বেল হয়ে উঠেছিল বাঙালির স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে মুক্তি পাগল বাঙালির ঐতিহাসিক সমাবেশে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। মূলত এটাই ছিল বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক।

৭১-এর ২৫ মার্চ মধ্যরাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিমাঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাঙালি সৈন্য, পুলিশসহ সকলকে পাকিস্তানি হানাদার বিতাড়নে অস্ত্র ধারণের নির্দেশ প্রদান করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাস- এ দীর্ঘ দশ মাস বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানি কারাগারে। তবু তাঁর প্রেরণায় উজ্জীবিত জাতি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ১৬ ডিসেম্বর সারা বাংলাদেশ হানাদারমুক্ত হয়।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে আসেন এবং রাষ্ট্রপতির পদে ইস্তফা দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু দেখতে পেলেন মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলার জনপদের জনবসতির যে ক্ষতি ও ধ্বংস সাধন করা হয়েছে, তা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়েও কোনো দেশের শত্রুপক্ষ করেনি, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর এতটা পরিকল্পিত আঘাত আসেনি।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

পাকবাহিনী গ্রামের ঘর-বাড়ি স্কুলঘর, বিশেষ করে হাট-বাজারগুলো জ্বালিয়ে দেয়। লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। নারী নির্যাতন করে চরম আকারে। যুদ্ধ নিয়মের বহির্ভূত এ ধরনের ধ্বংস পৃথিবীর ইতিহাসে পাওয়া যায় না। ব্যাংকের টাকা পোড়ানো এবং সরকারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তহবিল শূন্য করে ফেলা, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা, খাদ্যগুদাম পুড়িয়ে দেওয়া, কৃষি ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা, পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া বাঙালির স্থলে বিহারি অবাঙালিদের নিয়ে সমাজগঠন, এসব ছিল বাঙালি জাতিটাকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার উদ্দেশে পরিকল্পিত যজ্ঞ।

সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে সমস্ত খাদ্যশস্য সেনানিবাসে স্থানান্তরিত করেছিল পরিকল্পিতভাবে। ৯ মাস যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশের জনগণের জন্য খাদ্য আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল। যুদ্ধের জন্য অনেক ক্ষেতে ফসল বোনা সম্ভব হয়নি। ফলে স্বাধীনতার পরপরই দেখা গেল সরকারি খাদ্যগুদাম শূন্য । অন্যদিকে জেলা শহর এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় সেনানিবাসে কত লক্ষ টন খাদ্যশস্য পোড়ানো হয়েছে তার হিসাব পাওয়া যায়নি।

তবে সর্বত্রই খাদ্যশস্যের ছাই পাওয়া গেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রাথমিক জরিপে উল্লেখ আছে যে, শুধু খাদ্যশস্য আমদানি নয়, আগামী ফসল আবাদের জন্য কৃষকের হাতে তিন ভাগের এক ভাগ বীজধানও নেই। সার, কীটনাশক ওষুধ, হালের বলদ, পাওয়ার পাম্প, গভীর-অগভীর নলকূপ সবকিছুই নতুন করে সংগ্রহ করতে হবে বলে উল্লেখ করা হয়।

জরিপে আরো উল্লেখ করা হয়, চলতি মৌসুমেই তিন হাজার মণ গম বীজ, বোরো ধান বীজ ২ হাজার মণ, ৩০ হাজার টন সার, আলুবীজ ১৫০০ হাজার টন, ২০ হাজার পাওয়ার পাম্প তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন। অথচ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যা আছে তার পরিমাণ এতই নগণ্য যে, তাতে একশত ভাগের দশ ভাগ চাহিদাও মিটবে না। জরিপে কৃষি আবাদের একলক্ষ বলদ ছাড়াও দুগ্ধবতী গাভির কথা উল্লেখ করা হয়েছে ফলে আবাদে যেমন বিঘ্ন ঘটবে, তেমনি সারা দেশে শিশুরা দুধের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগবে।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

বিশ্বব্যাংকের জরিপে বসতবাড়িসহ সরকারি-বেসরকারি যে সকল অফিস আদালত, খাদ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল, গুদামঘর, স্কুল পুড়িয়ে দেওয়া হয় তার বিবরণে শুধুমাত্র গ্রামাঞ্চলেই ৪৩ লক্ষ বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। উল্লেখ করা হয়েছিল যারা ফিরে এসেছে তাদের জন্য কমপক্ষে ১০ লাখ বসতবাড়ি নির্মাণের প্রয়োজন তাৎক্ষণিকভাবে।

৩০ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতির কথা ঐ জরিপে উল্লেখ করা হয়েছি পাকিস্তানিদের কত সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ছিল, তারা চট্টগ্রাম বন্দরটি সম্পূর্ণভাবে শুধু ধ্বংসই করেনি বন্দর থেকে বহুদূর পর্যন্ত সমুদ্রপথে মাইন পেতে রেখেছিল, ফলে খাদ্যশস্য নিয়ে জরুরিভিত্তিতে কোনো জাহাজ এসে যে আউটারে নোঙর করবে সে উপায় ছিল না। তাছাড়া স্থলপথের রেলযোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

সড়ক যোগাযোগও ধ্বংস করা হয়েছিল সেতুগলো উড়িয়ে দিয়ে। খাদ্য পরিবহনকারী ট্রাক ও রেলবগিগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ৪৫ মাইল রেলপথ পুনঃস্থাপন না করা গেলে রেলযোগাযোগ বিশেষ পর্যায়ে আনা যাবে না। রেলইঞ্জিন মেরামতের কারখানাটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল ডিনামাইট দিয়ে ।

সড়ক বিভাগের রিপোর্টে (১৯৭২) উল্লেখ করা হয়েছিল, তাৎক্ষণিকভাবে ১৩০টি বড় ও মধ্যম ধরনের সেতু সম্পূর্ণ নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। ১৫০টি ইঞ্জিন চালিত ফেরির প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল, যতদিন সেতু নির্মাণ না করা হয়। অভ্যন্তরীণ নদীপথের সংস্কার ও কমপক্ষে ১৫০০টি খাদ্যবাহী কার্গোর প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছিল অর্থাৎ এতোসব অভাব পূরণ হলে তবেই সুষ্ঠু খাদ্যশস্য পরিবহন সম্ভব।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

২৩৭টি মাঝারি ও বড় আকারের শিল্প কারখানার ১৯৫টি কারখানাই আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত, এগুলো সংস্কারের জন্য যন্ত্রাংশ ও বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন। দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন। প্রায় সব মিল কারখানারই মালিক ছিল অবাঙালি-ব্যবস্থাপক পরিচালকগণও। ৬৬৩টি ছোট ধরনের কারখানার প্রায় সবকটিই বন্ধ। বিশ্বব্যাংকের মন্তব্য ছিল শুধুমাত্র ছোট ছোট কারখানাগুলো চালু করার জন্যই প্রায় ১ কোটি ডলার প্রয়োজন বিদেশ থেকে কাঁচামাল খরিদের জন্য ।

এ প্রতিবেদনে আরও মন্তব্য করা হয়েছে কলকারখানা পরিচালনার জন্য বাংলাদেশে আপাতত কোনো দক্ষ পরিচালক নেই। ৯০০ কলেজ, ৬ হাজার হাই স্কুল কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত । সব মিলিয়ে নতুন ৩ কোটি পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজন। কাগজ নেই । কাগজের কলসহ অন্যান্য কলকারখানায় শতকরা ৬৫ ভাগ বিহারী শ্রমিক ছিল। তারা ১৬ ডিসেম্বরের পর পালিয়েছে। খুলনা ও চন্দ্রঘোনা দুটি কাগজ কল নতুন করে চালু করতে কমপক্ষে ৬ মাসের প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সরকারের প্রাথমিক জরিপ হিসেবে বলা হয়েছিল, স্কুল কলেজগুলোর জন্য তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ১০ হাজার শিক্ষকের। সারাদেশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন। স্থানীয়ভাবে কোনো রকম বিদ্যুৎব্যবস্থা টিকে ছিল। শিল্পের জন্যও বিদ্যুতের অভাব হবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজন ছিল ১১ হাজার বিদ্যুৎ খুঁটির। ১৬ ডিসেম্বর সকালে স্টেট ব্যাংকের টাকা ব্যাংকের সামনে চত্বরে এনে পুড়িয়ে ফেলে।

বঙ্গবন্ধু প্রথম যেদিন টেলিফোনের রিসিভার হাতে তুলেছিলেন, সেদিন ঢাকা জেলা থেকে মাত্র তিনটি জেলার সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা ছিল অন্যান্য জেলাগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। এক হিসাবে দেখা যায়, যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যে সম্পদ ধ্বংস হয়েছে এবং যুদ্ধ পরবর্তীকালে তার যে অর্থনৈতিক প্রভাব সব মিলিয়ে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৩.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তৎকালীন সময়ের বিনিময় হার অনুযায়ী ১১,২৩৮.৩৬ কোটি টাকা।

এক কথায় নিষ্ঠুর ঔপনিবেশিক শোষণের অবসানে ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা পেল, তখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি বলতে কিছুই ছিল না, তা ধ্বংসের শেস সীমাতেই এসে পৌঁছেছিল।

এই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর সামনে যে বিশাল দায়িত্বগুলো অবশ্যই করণীয় ছিল, তা হলো পুনর্গঠন । রাশিয়া পুনর্গঠন অথবা জাপান, জার্মানি পুনর্গঠনের চেয়েও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ছিল আরও জটিল। রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক কোনোদিক থেকেই বাংলাদেশের পুনর্গঠন কারোর জন্যই সহজ ছিল না।

বাস্তব সমস্যাগুলো যা বঙ্গবন্ধুর সামনে ছিল সেগুলো মোটামুটি এই রকম:

  • যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন;
  • বাংলাদেশে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান এবং তাদের ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা;
  • প্রশাসন গড়ে তোলা;
  • আইন-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্যান্য বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাদের পুনর্বাসন;
  • জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা;
  • সড়ক, সেতু, রেললাইন পুনঃস্থাপন;
  • দালালদের বিচার করা;
  • বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানি বিহারী এবং পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালি সরকারি-বেসরকারি জনগণকে দেশে ফিরিয়ে আনা।
  • পরিত্যক্ত সম্পত্তি প্রভৃতি।

পুনর্গঠনের এই সময় সাপেক্ষ পদক্ষেপের পাশাপাশি স্বাধীনতা লাভের সাথে সাথেই যে বহুবিধ সমস্যা নতুন সরকারের আশু মনোযোগ দাবি করছিল, তার মধ্যে ছিল দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব, খাদ্যসামগ্রীর সীমিত সরবরাহ, শ্রমশক্তির বেকারত্ব আর ছিল লক্ষ লক্ষ সহায়সম্বলহীন মানুষ আর দেশে প্রত্যাবর্তনকারী অগণিত উদ্বাস্তু মিছিল। এইসব সমস্যার সমাধান যে কোনো সরকারের জন্য ছিল দুঃসাধ্য। আর সম্পদ ও বৈদেশিক মুদ্রাবিহীন এবং যথাযথ প্রশাসন যন্ত্রবর্জিত নতুন সরকারের জন্য এ ছিল এক অসম্ভব কাজ ।Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman 22 বঙ্গবন্ধুর সরকার

স্বাধীনতার পরপরই বঙ্গবন্ধু সরকার উপলব্ধি করেন যে, দেশে আগামী আমন ফসল পর্যন্ত ৩০ লক্ষ টন খাদ্য ঘাটতি হতে পারে। সরকারি গুদামসমূহ তখন প্রায় শূন্য ছিল। এমনকি দুমাসের মেয়াদে পূর্ণ ও সংশোধিত রেশন সরবরাহের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও ছিল না। খাদ্যের এই মজুদের পরিমাণ ছিল সর্বকালের জন্য ন্যূনতম।

মজুদ মাত্রার এ অবক্ষয় ছিল দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের আগে এ দেশকে দেউলিয়া করে ছেড়ে দেওয়ার ঐকান্তিক নীতির ফল। ফলে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিতকরণ এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। পরিকল্পনা কমিশন এবং সকল মন্ত্রণালয় কর্তৃক একযোগে অক্লান্ত পরিশ্রম করে এ সমস্যার মোকাবেলা করা হয়েছে। এজন্য ১৯৭১-৭২ সালে বড় কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর সরকারের পক্ষেই এই অসাধ্য সাধন করা সম্ভব হয়েছিল।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন

অর্থনৈতিক পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের পুনর্গঠন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংগঠন, প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা তহবিল সৃজন, নতুন বিনিময় হার স্থিরীকরণ এবং সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজের উপযোগী অর্থব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন।

বঙ্গবন্ধু এমন একটি অবস্থায় দেশের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করেছিলেন যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে এক আনার বৈদেশিক মুদ্রা এবং গোল্ড রিজার্ভ ছিল না। বরং পাকিস্তানিদের রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল। এমনি অবস্থা থেকে ব্যাংকে এক সুখপ্রদ স্বচ্ছল অবস্থা (liquidity position) সৃষ্টি করা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকে স্বচ্ছন্দ মজুদ গড়ে তোলা ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের অন্যতম অর্থনৈতিক সাফল্য।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে ব্যাংক আমানত ১২৫ কোটি টাকারও বেশি হয়েছিল অর্থাৎ শতকরা ৩০ ভাগেরও বেশি বেড়েছিল। ১৯৭৩-৭৪ সালেই স্বল্প ও মধ্যবিত্তদের উপকারার্থে গৃহ নির্মাণ ঋণদান কর্পোরেশন বহুতল বিশিষ্ট ফ্লাট বাড়ি নির্মাণ ও কিস্তি পরিশোধের ভিত্তিতে বণ্টনের কাজ হাতে নিয়েছিলো দেশ স্বাধীন হবার পর রাষ্ট্রায়ত্ত ৬টি ব্যাংক ও ৪টি পুনর্গঠিত অর্থসংস্থানকারী প্রতিষ্ঠান দেশে অর্থনৈতিক তৎপরতার পুনরুজ্জীবনের ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছিল।

জনসাধারণের সঞ্চিত অর্থ সহজে ব্যাংকে জমাকরণ বা ব্যাংক থেকে সহজে প্রয়োজন মাফিক ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সরকার ব্যাংকিং সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌছানোর লক্ষ্যে ব্যাংকের শাখার পরিমাণ যথেষ্ট বৃদ্ধিকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। নিয়ে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেশে বিভিন্ন ব্যাংকের শাখার পরিমাণের তথ্য উল্লেখ করা হলো :

বছর – ব্যাংকের মোট শাখার পরিমাণ
১৯৭২ – ১১৭৪
১৯৭৩ – ১২৭৩
১৯৭৪ – ১৪৯৩
১৯৭৫ – ১৫৯৪

উপরের তালিকা থেকে দেখা যায়, ১৯৭২ সালে দেশে ব্যাংকের মোট শাখার পরিমাণ ছিল ১১৭৪। ১৯৭৫ সাল নাগাদ সেই শাখার পরিমাণ প্রায় ৩৬% বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছিল ১৫৯৪ টিতে। দেশের দূরতম প্রান্ত অবধি ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণ ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের ব্যাংকিং সেক্টরের অন্যতম লক্ষ্য। এখানে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ্য তা হলো কৃষকদের হাতে কৃষিঋণ সহজলভ্য করার লক্ষ্যে কৃষি ব্যাংকের সংখ্যাই বেশি হারে বৃদ্ধি করা হয়েছিল ।

কোনো সমর্থন বা রিজার্ভ ব্যতীত সরকার বাংলাদেশে প্রচলিত সাবেক পাকিস্তান সরকারের ৩৫৮ কোটি টাকার দায় গ্রহণ করেছিল। এ প্রচলিত মুদ্রাংকের সমর্থনে ব্যবহৃত স্বর্ণ ও অন্যান্য জামানত করাচীতে সংরক্ষণ করা হতো বলে। সম্পদ থেকে দেশ বঞ্চিত হয়েছিল । ছয় মাসের মধ্যেই সরকার ৫০, ১০ ও ৫ টাকার পাকিস্তানি মুদ্রার প্রচলন প্রত্যাহার করে বাংলাদেশের নোট চালু করতে সমর্থ হয়েছিল।

একদিকে স্বাধীনতা লাভের দিনে বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল ছিল শূন্য অপরদিকে দেশের বন্দর দুটোই কার্যক্রমে না থাকায় রপ্তানির প্রবাহ ব্যাহত ছিল বিধায় বৈদেশিক মুদ্রা সহসা আহরণের পথও ছিল বন্ধ। তখন ১৮০ থেকে ৩৬০ দিনের বিলম্বিত পরিশোধ ব্যবস্থায় (Deferred payment system) অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কেনার বন্দোবস্ত করা হয়। ছয় মাসের মধ্যে সরকার ৯৫ কোটি টাকার মাল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছিল ।

দেশ স্টার্লিং এলাকার সদস্য হয়েছিল। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে একাউন্ট বা জমা খোলা হয়েছিল এবং সে জমায় বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ মাত্রা আশাতিরিক্ত হারে বেড়েছিল। দেশকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সদস্য করতে সক্ষম হয়েছিল, এই তহবিল থেকে স্বচ্ছন্দ ভাগ বা কোটা এবং প্রত্যাহার বা ড্রাইংয়ের অধিকার দেওয়া হয়েছিল।

পাকিস্তানের বিরোধিতা সত্ত্বেও স্বাধীনতা লাভের এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্ব ব্যাংকের সদস্য করানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলে দেয় চাঁদা বাবদ ২০ লক্ষ ডলার মূল্যের স্বর্ণ কানাডা সরকার থেকে সরাসরিভাবে ক্রয় করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল।

 

বঙ্গবন্ধু সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ:

 

আরও পড়ুন:

“বঙ্গবন্ধুর সরকার”-এ 12-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন