বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ রচনা ১০০০ + শব্দ | বাংলা প্রবন্ধ রচনা

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ রচনা ১০০০ শব্দ | বাংলা প্রবন্ধ রচনা: বাংলাদেশের কথা বললেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি প্রাসঙ্গিক ভাবেই আসে। আমাদের প্রায়ই বিভিন্ন পরীক্ষায়, অ্যাসাইনমেন্টে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ রচনা লিখতে হয়। যেহেতু তিনি স্বাধীনতার মহান স্থপতি, তাই তাঁকে নিয়ে গবেষণা ও চর্চা হবে যুগ যুগ ধরে।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ রচনা | বাংলা প্রবন্ধ রচনা
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, East Pakistan Visit, Pakistan 1969 [ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পূর্ব পাকিস্তান সফর, পাকিস্তান ১৯৬৯ ]
চর্চার অভাবে আমরা তাঁর জীবনী সঠিকভাবে জানি না। সেই কারণে যখন বিভিন্ন পরীক্ষায় কিংবা অ্যাসাইনমেন্টে তাঁকে নিয়ে লিখতে বলা হয়, তখন অনেকেই পর্যাপ্ত তথ্যবহুল রচনা লিখতে পারি না। তাই আজ আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য উপস্থাপন করছি “বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ রচনা” শীর্ষক প্রবন্ধটি। আশা করি, আপনারা বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সম্পর্কে এই প্রবন্ধ থেকে অনেক ইতিহাসের প্রয়োজনীয় তথ্যাদি জানতে পারবেন, যার মাধ্যমে তাকে নিয়ে প্রবন্ধ লেখার সামর্থ্য অর্জন করবেন।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman was arrested and taken to West Pakistan shortly before the start of Operation Search Light on March 25, 1971
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman was arrested and taken to West Pakistan shortly before the start of Operation Search Light on March 25, 1971

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ রচনা

ভূমিকাঃ

‘বাংলাদেশ’ নামটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।  পরাধীনতার শেকল থেকে বাঙ্গালীকে, আমাদেরকে,  এ জাতিকে মুক্ত করতে যিনি প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনিই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে হয়তো আজকের এই বাংলাদেশ সৃষ্টি হতো না। আমরা পেতাম না এই স্বাধীন বাংলার মুক্ত বাতাস, পেতাম না একটি স্বতন্ত্র বাংলাদেশের পতাকা। ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিটি ধাপে আমাদেরকে প্রস্তত করেছেন তিনি। এরপর প্রস্তত করেছেন চুড়ান্ত স্বাধীনতার জন্য। এই পুরো পথ পরিক্রমায় বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর পথ দর্শন, তার কৌশল, তার নেতৃত্বেই ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

যুগ যুগ ধরে সোনার বাংলাকে আক্রমণ করেছে বহু বহিশক্তি হানাদার বাহিনী। ইউরোপিয়ান বণিক, পর্তুগিজ, ইংরেজ থেকে শুরু করে বহু জাতি,  বহু বার বাংলার প্রাকৃতিক সম্পদের লোভে পড়ে, সেই সম্পদ লুট করার জন্য, এদেশে আক্রমন করেছে, এদেশের মানুষকে শাসন ও শোষণ করেছে। সর্বশেষ তদানীন্তর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী এদেশের মানুষের অধিকার কেড়ে নিলে স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার ব্রত গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়। তাই বাংলাদেশের কথা বললেই বলতে হয় বঙ্গবন্ধুর নাম।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman takes oath as the Prime Minister for the second time following the first elections held in an Independent Bangladesh, March 16, 1973
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman takes oath as the Prime Minister for the second time following the first elections held in an Independent Bangladesh, March 16, 1973

জন্ম পরিচয়:

শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে ১৯২০ সালের ১৭ ই মার্চ (৩ রা চৈত্র ১৩২৭ বঙ্গাব্দ) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শেখ ‍লুৎফুর রহমান, মাতা সায়েরা খাতুন। শেখ মুজিব, তাঁর পিত-মাতার তৃতীয় সন্তান।

শেখ মুজিবুর রহমানের নাম রাখেন তাঁর নানা শেখ আবদুল মজিদ। ছোটবেলায় বঙ্গবন্ধুর ডাক নাম ছিলো ‘খোকা’। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাধারণ মানুষ ও গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি সহমর্মী স্বভাব দেখাতেন।

শিক্ষা জীবন:

১৯২৭ সালে বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তখন তাঁর বয়স ছিলো ৭ বছর। তিনি গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯২৯ সালে ৯ বছর বয়সে তিনি গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। পিতার সরকারি চাকরিতে বদলিজনিত কারণে তিনি আবারো স্কুল পরিবর্তন করেন। ১৯৩১ সালে মাদারীপুর ইসলামিয়া স্কুলে তিনি ৪র্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুলেই তিনি ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।

১৯৩৪ সালে বেরিবেরি নামক এক জটিল রোগে আক্রান্ত হন বঙ্গবন্ধু। এতে করে তাঁর হৃৎপিণ্ড দুর্বল হয়ে যায়। তাঁর চোখেও জটিল রোগ ধরা পড়ে ১৯৩৬ সালে। অপারেশনের মাধ্যমে এ রোগ সারাতেও বেশ কিছু সময় লেগে যায়। তাই বেশ কয়েক বছর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন নি।

সুস্থ হওয়ার পর ১৯৩৮ সালে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে ভর্তি হন। এ সময় তিনি গৃহশিক্ষক হিসেবে এক ব্রিটিশবিরোধী সক্রিয় আন্দোলনকারী ও বিপ্লবীর সংস্পর্শ পান। ১৯৪১ সালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন বঙ্গবন্ধু।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে আই.এ এবং ১৯৪৭ সালে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। দেশভাগের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে ভর্তি হন। তবে কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাঁকে তখন বহিষ্কার করা হয়। ২০১০ সালে সে বহিষ্কার আদেশ তুলে নেওয়া হয়।

Sheikh Mujibur Rahman addressing a rally organized by Awami Muslim League at Armanitola Maidan (ground) (May, 1953).
Sheikh Mujibur Rahman addressing a rally organized by Awami Muslim League at Armanitola Maidan (ground) (May, 1953).

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন:

১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের সম্মেলনে যোগদানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময় বঙ্গবন্ধু ১৯৪৬ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

এ সময় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহকারী হিসেবে নিযুক্ত হন। ফলে সে বছরই প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধু। বিভিন্ন ইতিহাসবিদ বঙ্গবন্ধুকে “সোহরাওয়ার্দীর ছত্রতলে রাজনীতির উদীয়মান বরপুত্র” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু:

১৯৪৮ সালের ২৩ শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান। একই বছর মার্চের ২ তারিখ বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ১৯৫২ সালের ১৪ ই ফেব্রুয়ারি কারাগারে থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে অনশন করেন বঙ্গবন্ধু।

মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু:

মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অবদানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। ১৯৭০ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তবুও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে নানা টালবাহানা শুরু করে।

১৯৭১ সালের ১ লা মার্চ হোটেল পূর্বানীতে আ. লীগের সংসদীল সদস্যদের অধিবেশন চলাকাকালে আকস্মিকভাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনিদিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষনা করেন। সারা বাংলা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুদ্ধ জনসমুদ্রে পরিণত হয় রাজপথ। বঙ্গবন্ধু এটাকে শাসকদের আরেকটি চক্রান্ত বলে চিহ্নিত করেন। তিনি ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহবান করেন।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman casting his vote in the historic elections of the 1970 (December 7, 1970)
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman casting his vote in the historic elections of the 1970 (December 7, 1970)

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ ই মার্চ বঙ্গবন্ধু তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক যুগান্তকারী ভাষনে ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বঙ্গবন্ধুর এই ভাষনে ষ্পষ্ট হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যত। সারাদেশে শুরু হয় এক অভূতপূর্ব অসযোগ আন্দোলন।

এর মধ্যেই ২৫ শে মার্চ রাতের আঁধারে ঘটে যায় পৃথিবীর নৃশংসতম এক হত্যাকাণ্ড। এদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে মানুষের ঢল নামে। সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধু দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। রাত সাড়ে এগারটায় শুরু হয় অপারেশন সার্চ লাইট। ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা পরিচালনা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

গণহত্যার রাতেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হওয়ার আগে অর্থাৎ ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে রাত সাড়ে ১২ টার সময় বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেস যোগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পুনরায় পাঠ করা হয়। সারা বিশ্বে খবর ছড়িয়ে যায়, বাংলাদেশ নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হতে চলেছে!!

গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি ছিলেন। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে আমাদের দেশকে শত্রুমুক্ত করেন এদেশের সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধারা।

Bangladesh’s Prime Minister Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman observes the exit parade of the Indian Army stationed in Bangladesh, March 12, 1972
Bangladesh’s Prime Minister Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman observes the exit parade of the Indian Army stationed in Bangladesh, March 12, 1972

শোকাবহ ১৫ ই আগস্ট:

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশটি নতুন করে গড়ে তোলার ব্রত নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু, দেশপ্রেম ও নীতির কারণে স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্ষূশূলে পরিণত হন তিনি। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটিকেও যারা লুটেপুটে খেতে চেয়েছিলো, সেই বন্ধুরূপী শত্রুদের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে শহিদ হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এদেশের কতিপয় বিপথগামী সৈন্য, রাজনৈতিক নেতা ও বন্ধুরূপী শত্রুদের যোগসাজশে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman addresses the United Nations General Assembly at New York in BANGLA for the first time, September 24, 1974
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman addresses the United Nations General Assembly at New York in BANGLA for the first time, September 24, 1974

উপসংহার

বাংলাদেশের জন্য, আমাদের জন্য, সব মানুষের তরে নিজের পুরো জীবনটাই সমর্পণ করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এদেশের মানুষের কল্যাণে, তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করতে গিয়ে নিজের জীবনের একটা বড় অংশ তিনি কাটিয়েছেন কারাগারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং জাতি হিসেবে মাথা তুলে দাড়ানোয় তাঁর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরকাল।

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ চিরকাল এক ও অভিন্ন হয়েই থাকবে। এদেশের শিশু-যুবক-বৃদ্ধ সবাই গর্বভরে লিখে যাবে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ রচনা। কবি যথার্থই বলেছেন-

যতকাল রবে পদ্মা-মেঘনা-গৌরী যমুনা বহমান,

ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন