১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু মুজিব গ্রেফতারে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও সংগঠন – এইচ. টি. ইমাম

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু মুজিব গ্রেফতারে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও সংগঠন [ Reactions of World leaders and organizations after arrest of Bangabandhu Mujib in 1971] : ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক গ্রেফতারের পরে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠন বিভিন্ন ভাবে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে। এখানে তার কিছু তুলে ধরা হলো।

সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল তারিখে পত্র লিখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর কারা নির্যাতনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তার কয়েক দিন আগে ২৮ মার্চ করাচিস্থ সোভিয়েত কনসাল জেনারেল পাকিস্তান সরকারকে পদগর্নির মৌখিক বার্তা অবহিত করে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনা সম্পর্কে তথ্য জানতে চান।’

১৯৭১ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের কারণ জানতে চেয়ে তেহরান থেকে প্রকাশিত ‘কায়হান ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকার সাংবাদিক আমির তাহেরি জেনারেল টিক্কা খানকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনি শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করেছিলেন কেন?’ টিক্কা খান জবাবে বলেছিলেন যে, শেখ সাহেবের স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার কথা তার কো-অর্ডিনেশন অফিসার স্বকর্ণে শুনে তা আমাকে জানায়। তিনি নিজেও রেডিওর বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিতে তা শুনেছেন। তাই শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা ছাড়া তার কোনো গত্যন্তর ছিল না।

ঐ সাংবাদিকের আর এক প্রশ্নের উত্তরে টিক্কা খান বলেছিলেন, ‘আমি খুব ভালো করে জানি মুজিবের মতো একজন নেতা তার জনগণকে পরিত্যাগ করবে না। আমি গোটা ঢাকা শহর তাকে খুঁজে বেড়াতাম, একটি বাড়িও তল্লাশীর বাইরে রাখতাম না। তাজউদ্দীন অথবা তার মতো অন্য কোনো নেতাকে গ্রেফতার করার কোনো পরিকল্পনা আমাদের ছিল না।’… ঢাকায় গ্রেফতারের তিন দিন পর অর্থাৎ ২৯ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে প্লেনে পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া হয়।

গান্ধী ফাউন্ডেশন, আন্তর্জাতিক জুরিস্ট কমিশন, মার্কিন আন্তর্জাতিক কাউন্সিল সম্মেলন, বুদাপেস্ত শান্তি সম্মেলন প্রভৃতি সংগঠন ও সমাবেশ শেখ মুজিবের মুক্তি, সামরিক নির্যাতন রোধ ইত্যাদি বিষয়ে দাবি তোলে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার এবং শাস্তির জন্য তার জেনারেলদের দিক থেকে জোর চাপের মধ্যে ছিলেন বলে বিভিন্ন আলাপচারিতায় জানান। এই প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নগ্ন চেহারা প্রকাশ পায়।

জান্তা তথাকথিত বিচারানুষ্ঠানের আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার চক্রান্ত করছে, এমন ইঙ্গিত উক্ত প্রতিবেদন ছাড়াও অন্যান্য সূত্রে পাওয়া যায়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান সামরিক জান্তা একমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকেই পাকিস্তানের শত্রুমনে করেছিল। কারণ, বঙ্গবন্ধুই ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণাকারী, আর কেউ নয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে যে কঠোর ও হিংসাশ্রয়ী মনোভাব পোষণ করতেন, তা অন্য কোনো নেতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেক্টর কমান্ডারগণ অথবা মেজর, ক্যাপ্টেনের ক্ষেত্রে করতেন না।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মনোভাব সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধুর নিজের ধারণা তিনি প্রখ্যাত সাংবাদিক-সম্পাদক ওবায়দুল হকের কাছে ব্যক্ত করেছিলেন, পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন ‘পাকিস্তানি সামরিক শাসকবৃন্দ তাঁকে দৈহিকভাবে দখল করেছিল। তারা তার হতাশার মুহূর্তে, তার দেহ নিয়ে যা খুশি করতে পারতো। তবে তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, তারা যদি তাকে হত্যাও করে, তার দেশের মানুষ তার নেতৃত্বে সূচিত মুক্তিযুদ্ধকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দেবে এবং স্বাধীনতা অর্জন করবে।”

পাকিস্তান পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সংকল্পের কথা অবহিত হয়ে তাকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, ইয়াহিয়ার হাতে নিহত হওয়ার চেয়ে অনেক বড় মাপের মানুষ শেখ মুজিব। ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা না করতে পরামর্শ দেন। কিন্তু দাম্ভিক ইয়াহিয়া সেদিন ভুট্টোর সঙ্গেও খুব তাচ্ছিল্যের সুরে কথা বলেছিলেন। ভুট্টো তার রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন যে, ২৬ মার্চ রাতের প্রথম প্রহরে যখন শেখ মুজিবকে ইয়াহিয়ার বাহিনী হত্যা করতে পারেনি, তখন শেখ মুজিবকে হত্যা করতে তথাকথিত একটা বিচারানুষ্ঠান ইয়াহিয়াকে করতে হবে।

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু মুজিব গ্রেফতারে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও সংগঠন - এইচ. টি. ইমাম
১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু মুজিব গ্রেফতারে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও সংগঠন – এইচ. টি. ইমাম

লেখক:

এইচ. টি. ইমাম

বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১-১৯৫৭ বই এর তৃতিয় অধ্যায় [পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ] থেকে উধৃত

বঙ্গবন্ধু বিষয়ে এইচটি ইমাম আরও লিখেছেন:

রেফারেন্স :

৬। তেহরান থেকে প্রকাশিত কায়হান ইন্টারন্যাশনাল পত্রিকায় ১১ আগস্ট ১৯৭১ তারিখে প্রকাশিত আমির তাহেরি তার লেখা ‘দ্য ডিক্লাইন অ্যান্ড ফল অব শেখ মুজিব’ শীর্ষক প্রবন্ধে এসব কথা বলেছেন।

৭। রবার্ট পেইন রচিত এবং নিউইয়র্ক থেকে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ম্যাসাকর নামক গ্রন্থের ৮৮-৮৯ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।

৮।  ভারতের ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় ১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট ‘মুজিবস ট্রায়াল বিগিনস ইন্ডিয়া অ্যাপিলস ট নেশনস’ শীর্ষক এমন একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

৯। March 26, 1971

মন্তব্য করুন