মুদ্রাস্ফীতি রোধ ও সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ

বঙ্গবন্ধুর সরকার – মুদ্রাস্ফীতি রোধে পদক্ষেপ : ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি । এই মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম কারণ হলো স্বাধীনতা লাভের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের জন্য উদার মুদ্রানীতি অনুসরণ করে (ব্যাপক মুদ্রার যোগান বৃদ্ধি ও উদার ঋণনীতি) ব্যাপক হারে অর্থ ব্যয় আবার অন্যদিকে শিল্প-কারখানা ব্যাপক উৎপাদন হ্রাস ।

মুদ্রাস্ফীতি রোধ ও সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ

মুদ্রাস্ফীতি রোধ ও সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ১৯৭১ সালে ১৭ ডিসেম্বর দেশে মুদ্রা সরবরাহের পরিমাণ ছিল ৩৩৩.২৬ কোটি টাকা ১৯৭৩ সালের জুন মাস নাগাদ দেশে মুদ্রা সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৬৯৬ কোটি টাকা । অন্যদিকে ১৯৬৯-৭০ সালের তুলনায় ১৯৭২-৭৩ সালে বিভিন্ন কারণে উৎপাদন হ্রাস পায়। উৎপাদন হ্রাস পাবার বিভিন্ন কারণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল প্রথমত, ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তির অভাব, দ্বিতীয়ত, আমদানিকৃত পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব, তৃতীয়ত, শ্রমশক্তিকে সদিচ্ছা প্রণোদিত করে তার পূর্ণ সদ্ব্যবহারে অপারগতা, চতুর্থত, বিভিন্ন কল করখানায় সুচারু কর্মসংস্থানের উপযোগী সাংগঠনিক কাঠামো নির্মাণে অসুবিধা এবং পঞ্চমত, বিভিন্ন কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন।

এসকল কারণে ১৯৭২-৭৩ সালে ১৯৬৯-৭০ সালের তুলনায় উৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল শতকরা ১৫ ভাগ। সুতরাং যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের জন্য উদার মুদ্রানীতি গ্রহণের ফলে মুদ্রার যোগান বৃদ্ধি পায় ২.০৯ গুণ অন্যদিকে বিভিন্ন কারণে উৎপাদন হ্রাস পায় ১৫ শতাংশ।

মুদ্রাস্ফীতির এই দুই বিপরীতমুখী প্রভাবে প্রকৃত দ্রব্যমূল্য সূচক বা জীবনযাত্রার ব্যয় কত হতে পারে তা এভাবে নির্ণয় করা যেতে পারে। ধরা যাক ১৯৬৯-৭০ সালে দেশে মোট উৎপাদন ছিল ১০০ টন এবং মুদ্রা সরবরাহের পরিমাণ ছিল ৩৩৩,২৬ কোটি টাকা । সেই হিসেবে প্রতি টন পণ্যের গড় দাম হয় ৩.৩৩ কোটি টাকা। ১৯৭২-৭৩ সালে পণ্যের উৎপাদন ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় ৮৫ টন। পক্ষান্তরে মোট মুদ্রার সরবরাহের পরিমাণ ছিল ৬৯৬ কোটি টাকা।

সেই হিসেবে প্রতি টন পণ্যের গড় দাম ৮.১৯ কোটি টাকা । ১৯৬৯-৭০ সালে ১ টন পণ্যের গড় দাম দাঁড়ায় ৩.৩৩ কোটি টাকা পক্ষান্তরে ১৯৭২-৭৩ সালে ১ টন পণ্যের গড় দাম দাঁড়ায় ৮.১৯ কোটি টাকা অর্থাৎ ১৯৬৯-৭০ সালে দ্রব্যমূল্যসূচক বা জীবনযাত্রার ব্যয় যদি ১০০ হয় সে ক্ষেত্রে ১৯৭২-৭৩ সালে দ্রব্যমূল্যসূচক বা জীবনযাত্রার ব্যয়সূচক হয় ৮.১৯/৩.৩৩ x ১০০ = ১৪৬ (প্রায়)।Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman 22 মুদ্রাস্ফীতি রোধ ও সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ

এছাড়া ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশে আমদানিকৃত অধিকাংশ দ্রব্য বিশেষ করে খাদ্যশস্য, সার, অপরিশোধিত তেল, তুলা, সুতা, চিনি ইত্যাদি পণ্যের মূল্য বিশ্বের বাজারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য যে স্বাধীনতা লাভের পর টাকার বিনিময় হারের সামঞ্জস্য বিধানের ফলেও সকল আমদানিকৃত দ্রব্যের স্থানীয় মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছিল । স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৬৯-৭০ সালে ডলার ও টাকার বিনিময় হার ছিল ১ ডলার = ৪.৭৬ টাকা। স্বাধীনতা লাভের পর টাকার মান ৫৪ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ডলারের সাথে বাংলাদেশের টাকার বিনিময় হার নির্ধারিত হয় ১ ডলার = ৭.৩৩ টাকা।

১৯৭২ সালের অনাবৃষ্টি ও খরার জন্য আউশ ও আমন ফসলের উৎপাদন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে শুধু বাংলাদেশেরই নয় সমগ্র বিশ্বে বিশেষত এশিয়ায় খাদ্যশস্য উৎপাদন যথেষ্ট হ্রাস পায়, ফলে বিশ্বের বাজারে খাদ্যশস্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই হিসাব অনুযায়ী যদিও ১৯৭২-৭৩ সালে দ্রব্যমূল্য সূচক বা জীবনযাত্রার ব্যয়সূচক যেখানে ১৪৬ হওয়ার কথা সেখানে পণ্য আমদানিসহ বঙ্গবন্ধু সরকারের বিচক্ষণ অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশের দ্রব্যমূল্য সূচক ১৮১.৫৫ রাখতে সক্ষম হন।

মুদ্রাস্ফীতির এই চাপ সম্পর্কে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন “মুদ্রাস্ফীতির এই প্রবল চাপ শুধু গণজীবনেই দুঃসহবোধ হয়নি, উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের ব্যয়ও বাড়িয়ে তুলেছে ।” বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীর এই উক্তি এটিই প্রমাণ করে যে বঙ্গবন্ধু সরকার মুদ্রাস্ফীতি সম্পর্কে কতটা সচেতন ছিলেন। যেহেতু মুদ্রাস্ফীতির এই কুফল সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন সুতরাং এটা বোঝার কিছু বাকি থাকে না যে বঙ্গবন্ধু সরকারের মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস করার জন্য চেষ্টারও কমতি ছিল না। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে মুদ্রাস্ফীতি রোধকল্পে বঙ্গবন্ধু সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে। এছাড়া মুদ্রানীতিতেও এনেছিলেন যথেষ্ট পরিবর্তন।

মুদ্রানীতিতে পরিবর্তনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, ঋণ সংকোচন নীতি অনুসরণ। ১৯৭৪ সালের জুন মাস থেকে ব্যাংক রেট শতকরা ৫ ভাগ বৃদ্ধি করে ৮ ভাগ করা হয়েছিল। ব্যাংক ঋণের উপর সুদের হার শতকরা ১২ ভাগ থেকে ১৩ ভাগ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ দেওয়া বন্ধ করা হয়েছিল। ঋণ প্রদানের ব্যাপারে ব্যাংকগুলিকে বিধিবদ্ধ নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ১০০ টাকা নোট বাতিল করা হয়েছিল।Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman 19 মুদ্রাস্ফীতি রোধ ও সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ

এই সকল পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ১৯৭৫ সালে মুদ্রাস্ফীতির চাপ অনেকটা হ্রাস পায়। চালের দাম আট টাকা থেকে সাড়ে পাঁচ টাকায় নেমে আসে, আলু দুই টাকা পাঁচ পয়সা থেকে দেড় টাকায় নেমে আসে। ঢাকা শহরে মধ্যবিত্তের ব্যয়সূচক ৪৫৮.৫ (জানুয়ারি) থেকে ৪১৬.৯ (এপ্রিল) এবং খাদ্য মূল্যসূচক একই সময়ে ৫৪৬.৩ থেকে ৪৫১.০-তে হ্রাস পায়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো ১৯৭৬-৭৭ সাল থেকে দেশে দ্রব্যমূল্য সূচক বা জীবনযাত্রার ব্যয়সূচক কম-বেশি যে হারেই হোক না কেন—তা বৃদ্ধি পেয়েছিল, কোনদিন কমেনি। কোন সরকারের পক্ষে তা কমানো সম্ভব হয়নি। দ্রব্যমূল্যসূচক বা জীবনযাত্রার ব্যয়সূচক এক বছরই হ্রাস পেয়েছিল, তা হলো ১৯৭৫-৭৬ সালে। ১৯৭৫-৭৬ সালে এই সূচক ৪০৭.৫৮ থেকে হ্রাস পেয়ে ৩৮০.১৪-তে এসেছিল।

এই হ্রাস যখন হয়েছিল তখন যদিও বঙ্গবন্ধু সরকার ক্ষমতায় ছিলেন না, তথাপি এটি নিঃসন্দেহে বলা সম্ভব যে বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের ফলেই ঐ দ্রব্য মূল্য সূচকের হ্রাস । সুতরাং বঙ্গবন্ধু সরকারই সম্ভব করেছিলেন দেশে দ্রব্যমূল্যসূচক বা জীবনযাত্রার ব্যয়সূচক হ্রাস করতে ।

সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য ত্রুটি হচ্ছে সম্পদের অপচয় । প্রায় প্রতিটি সেক্টরে সম্পদের অপচয় হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে দেশে সরকারি সম্পদ অপচয়ের কিছু ঘটনা নিম্নরূপ :

দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের অফিস, বাসা-বাড়ি, রাস্তা ঘাট, জায়গা-জমিসহ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি বর্তমানে অরক্ষিত রয়েছে । কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ১৩টি উপজেলা জুড়ে ছড়িয়ে আছে প্রকল্পের স্থাপনা-সমূহ। দিনে দিনে চলছে লুট-পাট ও অবৈধ দখলদারিত্ব, (দৈনিক ইত্তেফাক ১/১১/২০০৪)। কুড়িগ্রাম পুরাতন রেলস্টেশনে তিন মাস ধরে ট্রেন আসে না।

রেলস্টেশন তুলে দিয়ে এখানে নির্মাণ করা হবে বাস টার্মিনাল ও ডিপো। কিন্তু কখন কাজ শুরু হবে তার খবর নেই। কাজের কোন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। স্টেশন ও রেলপথের বিভিন্ন সম্পদ চুরি হয়ে যাচ্ছে (দৈনিক ইত্তেফাক ১২/০২/২০০৪)। মির্জাপুরে বিএডিসি’র মূল্যবান যন্ত্রপাতি এবং ভবনগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।

Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman
Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman

মির্জাপুরের বিভিন্ন গ্রামে সরকারিভাবে স্থাপিত ২৩৮টি নলকূপ ও পাওয়ার পাম্প এবং বীজাগার ভবন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। যে ২৩৮টি অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হয় তার দাম প্রায় ২৮ কোটি টাকা। কলেজ রোডে বিএডিসি’র ১৮ শতাংশ জমিসহ ভবনগুলো ইতিমধ্যে দখল হয়ে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকা মেশিনপত্রের মূল্যবান যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে, (দৈনিক প্রথম আলো)।

এইভাবে সরকারের বিভিন্ন সেক্টরের বিভিন্ন সম্পদ অপচয়ের ঘটনা প্রায় অহরহই ঘটে যাচ্ছে। আমাদের দেশের সাধারণ জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাঝেও সরকারের সম্পত্তি রক্ষা করার চেষ্টা খুব একটা লক্ষ্য করা যায় না।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রাষ্ট্রের সম্পত্তি অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট তৎপর ছিলেন। এই প্রসঙ্গে ২১ জুলাই ১৯৭৫ নবনিযুক্ত গভর্নরদের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ভাষণ দান কালে বঙ্গবন্ধু বলেন, “এই ঢাকা শহরের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে আমি দেখেছি, কোটি কোটি টাকার মাল এখানে সেখানে পড়ে থাকে। তেজগাঁও এয়ারপোর্টের কাছে মাল পড়েছিল। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের কাছে মাল পড়েছিল। কিছু মাল পড়েছিল অন্যান্য জায়গায়। এটা কার? এটা আমার নয়; টিএন্ডটির। এটা কার? এটা আমার নয়, সিঅ্যান্ডবি’র। আমি বললাম, এ সব কথা আমি বুঝি না। আগামীকালের মধ্যেই সব মাল পরিষ্কার করে নেওয়া হোক।”

বঙ্গবন্ধুর এই কার্যক্রম এটাই প্রমাণ করে যে, তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। একজন সরকার এবং রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে সরকারি সম্পত্তিকে অপচয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য নিজে ব্যক্তিগতভাবে যে উদ্যোগী হয়েছিলেন, তা বাংলার ইতিহাসে এক অকল্পনীয় ঘটনা।

আরও পড়ুন:

বঙ্গবন্ধুর সরকার

“মুদ্রাস্ফীতি রোধ ও সরকারি সম্পদের অপচয় রোধ”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন