১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫ সালের কুমিল্লায় সামরিক একাডেমীতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫ সালের কুমিল্লায় সামরিক একাডেমীতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণঃ বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর প্রধান, বাংলাদেশ সামরিক একাডেমীর অধ্যক্ষ ও আমার ক্যাডেট ভাইয়েরা, আপনারা সকলেই আমার আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করুন। আমরা পাকিস্তানি আমলে বাংলাদেশে সামরিক একাডেমী প্রতিষ্ঠার জন্য বহুকাল সংগ্রাম করেছিলাম।

 

১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫ সালের কুমিল্লায় সামরিক একাডেমীতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫ সালের কুমিল্লায় সামরিক একাডেমীতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫ সালের কুমিল্লায় সামরিক একাডেমীতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

কিন্তু এতে কোন ফল হয়নি। আজ লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। সেই জন্যই আজ বাংলাদেশের মাটিতে বাংলাদেশ সামরিক একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই উপলক্ষে আমি স্মরণ করি সেই সমস্ত শহীদ ভাইদের, যারা স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিয়েছে, আত্মাহুতি দিয়েছে। আমি স্মরণ করি বাংলার ৩০ লক্ষ মানুষকে, যারা রক্ত দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছে।

তাদের জন্য গর্বে আমার বুক সত্যই ভরে ওঠে । তাদের জন্যই বাংলাদেশের মালিক আজ বাংলাদেশের জনসাধারণ। তাদের জন্যই সম্ভব হয়েছে আমাদের নিজেদের মাটিতে সামরিক একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা । আমি আশা করি, ইন্শাল্লাহ, এমন একদিন আসবে, যখন এই একাডেমী শুধু দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়াই নয়, সারা দুনিয়াতেই সম্মান অর্জন করবে।

ক্যাডেট ভাইয়েরা,

আজ তোমরা তোমাদের ট্রেনিং শেষ করলে কিন্ত তোমাদের মনে রাখতে হবে- এটা এক পর্যায়ের শেষ আর এক পর্যায়ের শুরু ।পরের পর্যায়ের দায়িত্ব অনেক বেশী। আজ তোমরা ট্রেনিং সমাপ্ত করে সামরিক বাহিনীর কর্মচারী হতে চলেছ। এখন তোমাদের ওপর আসছে দেশ এবং জাতির প্রতি দায়িতু। জনগণের প্রতি দায়িত্ব। যে সমস্ত সৈনিকদের তোমরা আদেশ-উপদেশ দেবে, তাদের প্রতি দায়িতৃ। তোমাদের কমাণ্ডের প্রতি দায়িত্ব এবং তোমাদের নিজেদের প্রতি দায়িত্ব।

তোমাদের এখনদায়িতৃজ্ঞান থাকা প্রয়োজন। তা না থাকলে তোমরা জীবনে মানুষ হতে পারবে না। শৃঙ্খলা ছাড়া কোন জাতি বড় হতে পারেনি। আমি অবশ্য জানি, আজ আমাদের এই একাডেমীর ধরতে গেলে কিছুই নেই। আমরা সামান্য কিছু জিনিস নিয়ে এর কাজ শুরু করেছিলাম । অনেক অসুবিধার মধ্যে তোমাদের ট্রেনিং নিতে হয়েছে। সব জিনিস তোমাদের আমরা দিতে পারিনি। তোমাদের কমাণ্ডাররা অনেক অসুবিধার মধ্যে তোমাদের ট্রেনিং দিয়েছেন।

কিন্ত আজ আমি যা দেখলাম, তাতে আমি বিশ্বাস করি, পূর্ণ সুযোগ- সুবিধা পেলে আমাদের ছেলেরা যে কোন দেশের যে কোন টৈনিকের সাথে মোকাবেলা করতে পারবে। তাদের সে শক্তি আছে। তবে একদিনে কিছুই হয় না। আমরা তিন বছর হল স্বাধীনতা পেয়েছি। এরমধ্যে একাডেমীর জন্য যা যতটুকু দরকার, তার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করা হয়নি। এমনকি, আমার নিজের চেষ্টায়ও এটা-ওটা যোগাড় করে এক্ষেত্রে কাজ আরম্ত করা হয়েছে।

পাকিস্তানী সেনাবাহিনীতে বাঙ্গালীর স্বল্পতা

তোমরা তখন বাচ্চা ছিলে কিংবা ছোট ছিলে। স্কুলে পড়তে ।সব কথা তাই তোমরা জানো না। পাকিস্তানীরা দুনিয়াকে বুঝিয়েছিল যে, বাঙ্গালীরা যুদ্ধ করতে জানে না। তারা বাঙ্গালীকে সৈন্যবাহিনীতে নিত না। আমার মনে পড়ে, অনেক আগে, যখন আইয়ুব খান কমাগ্ডার-ইন-টীপ ছিলেন, তখন তিনি গোপনে একটি সার্কুলার দিয়েছিলেন, সেনাবাহিনীতে যেন শতকরা দুইজনের বেশী বাঙ্গালী নেয়া না হয়।

যেভাবেই হোক, সেই সার্কুলার আমি পেয়ে যাই এবং সেটা নিয়ে তোলপাড় শুরু করি। হুকুমটি পরে তারা প্রত্যাহার করেন কিন্তু তারপরও ছলেবলে কৌশলে বাঙ্গালীদের দাবিয়ে রাখেন।পাকিস্তানীরা বলতো, বাঙ্গালীরা সামরিক বাহিনীতে যোগদানের অযোগ্য। তারা কাপুরুষ, তারা বুদ্ধ করতে জানে না। কিন্তু পাকিস্তানের সৈন্যরা বাংলাদেশের মাটিতে দেখে গেছে বাঙ্গালীদের যুদ্ধ করবার ক্ষমতা কেমন।

মুক্তিবাহিনীর ভয়ে তাদের বড় বড় শক্তিধর বিশালদেহ পুরুষেরও জান বেরিয়ে যেত। আমরা বাঙ্গালীরা আর যা-ই হই না কেন কাপুরুষ নই। আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে ভালবাসতেও জানি।

স্বাধীনতার সংগ্রাম

বাঙ্গালীরা যুগ যুগ ধরে পরাধীন ছিল। দু’শো বছর আমরা  এংরেজদের  অধীনে ছিলাম । তারপর পঁচিশ বছর পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যালঘু দল ছলে বলে কৌশলে আমাদের বাংলাদেশের মাটি দখলে রেখে শোষণ করে। এই ক্যান্টনমেন্টে তখন বাঙ্গালীদের স্থান ছিল না। এখান দিয়ে যাওয়ার সময় বাঙ্গালীদের রাস্তায় অপমান করা হত। আমার সবই জানা আছে। এখান দিয়ে গাড়ী করে যাওয়ার সময় আমার সারা শরীর জুলে উঠতো । আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, দুশমনদের বাংলাদেশের মাটি থেকে উত্খাত করবো।

তখন আমাদের অনেক ব্যথা, অনেক দণ্ড, অনেক জুলুম, কারাগারে অনেক নির্যাতন সইতে হয়েছে। আমিই শুধু নই, হাজার হাজার কর্মী এসব সহ্য করে বাংলাদেশের মাটিকে মুক্ত করবার জন্য সংগ্রাম করেছে। তোমাদের এখন একটা জিনিস মনে রাখা দরকার। দেশ যখন আমাদের আছে, মাটি যখন আমাদের আছে, বাংলাদেশের সোনার মানুষ যখন আছে, তখন আমরা সবই পাবো। কিন্তু তা হবে, যদি আমরা সোনার ছেলে তৈরী করতে পারি, তাহলে ইনশাল্লাহ আমার স্বপ্নের সোনার বাংলা একদিন অবশ্যই হবে ।

আমি হয়ত দেখে যেতে পারবো না। বা র মাটি থেকে বাংলাদেশের সম্পদ কেউ লুট করে নিতে পারবে না। বাংলাদেশের মাটিতেই বাংলাদেশের সম্পদ থাকবে । বাংলাদেশের মানুষই তা ভোগ করবে। যে জাতির ৩০ লক্ষ লোক স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিতে পারে, স্বাধীনতা রক্ষার জন্য দরকার হলে সে জাতির এক কোটি লোক জীবন দেবে।

 

১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫ সালের কুমিল্লায় সামরিক একাডেমীতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫ সালের কুমিল্লায় সামরিক একাডেমীতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

ট্রেনিংপ্রাপ্ত ক্যাডেটদের কর্তব্য

ছেলেরা আমার, তোমরা নতুন জীবনে যাচ্ছ। মনে রেখো, তোমরা এখন সামরিক কর্মচারী। তোমাদের অধীনে থাকবে আমাদের সেনাবাহিনী ।তাদের কাছে অনেক কিছু শেখবার আছে। তাদের সঙ্গে মিশতে হবে, তাদের জানতে হবে । দুঃখের সময় তারা ডাক দিলে কাছে যেতে হবে । তাদের পাশে থাকতে হবে । মনে রেখো, শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে। তোমরা শাসন করবে, তাই সোহাগ করতেও শিখবে । তাদের দুঃখের দিনে পাশে দীড়িয়ো, তাদের ভালবেসো। কারণ তোমাদের হুকুমেই তারা জীবন দেবে।

তোমাদের শ্রদ্ধাও অর্জন করতে হবে । আর সে শ্রদ্ধা অর্জন করতে হলে শৃঙ্খলা শিখতে হবে। নিজেদের সৎ হতে হবে। নিজেদের দেশকে ভালবাসতে হবে। মানুষকে ভালবাসতে হবে এবং চরিত্র ঠিক রাখতে হবে। অন্যথায় কোন ভাল কাজ করা যাবে না । মনে রেখো, তোমরা বাংলাদেশের সামরিক একাডেমীর প্রথম রুযাডেট। ভবিষ্যতে যেসব ছেলে এখানে আসবে, তারা তোমাদের দিকে তাকাবে ।

তোমাদের কাছ থেকে অনেক জিনিস শিখতে চাইবে । তখন তোমরা আমার মুখ কালো করো না, দেশের মুখ কালো করো না, সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুখ কালো করো না। তোমরা আদর্শবান হবে, সৎ পথে থাকবে। মনে রেখো, মুখে হাসি, বুকে বল, তেজে ভরা মন, মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন।

দূর্ণীতি নির্মূল করতে হবে

মাঝে মাঝে আমরা অমানুষ হয়ে যাই। আমরা এত রজত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। তরু অনেকের চরিত্র পরিবর্তন হয়নি। ঘুষখোর, দুর্ণীতিবাজ, চোরাকারবারী আর মুনাফাখোর বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। দীর্ঘ তিন বছর আমি তাদের কাছে অনুরোধ এবং আবেদন জানিয়েছি, তাদের হুমকি দিয়েছি কিন্তু চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী। তাই আর অনুরোধ আবেদন বা হুমকী নয় এবার বাংলাদেশের মানুষকে বাঁচাতে হবে। তাদের জন্য আমি আমার জীবন কারাগারে কাটিয়ে দিয়েছি

। তাদের দুঃখ দেখলে আমি পাগল হয়ে যাই। তারাও আমাকে ভালবাসে । কালও ঢাকা থেকে আসার সময় আমি দেখেছি, মানুষ খাবারের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে, তাদের গায়ে কাপড় নেই, আরও নানা রকম অসুবিধার মধ্যে তারা বাস করছে। তা সত্তেও হাজার হাজার মানুষ আমাকে দেখবার জন্য রাস্তার দু’পাশে দীঁড়িয়েছিল। আমি মাঝে মাঝে তাদের জিজ্ঞেস করি, তোমরা আমাকে এত ভালবাসো কেন? যে দুঃখী মানুষ দিনভর পরিশ্রম করে, তাদের পেটে খাবার নেই, গায়ে কাপড় নেই, বাসস্থানের বন্দোবস্ত নেই, লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার।

পাকিস্ত বনীরা আমাদের সর্বস্ব লুট করে নিয়ে গেছে। কাগজ ছাড়া আমাদের কারও জন্য কিছু রেখে যায়নি। আমাকে বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে সব জিনিস আনতে হয়। কিন্ত চোরের দল সব লুট করে খায়। দুঃখী মানুষের সর্বনাশ করে। এবার আমি তাই শুধু জরুরী অবস্থাই ঘোষণা করিনি । আমি প্রতিজ্ঞা করেছি_ বাংলাদেশের মাটি থেকে ঘুষখোর,দুর্নীতিবাজ, মুনাফাখোর আর চোরাচালানকারীদের নির্মূল করবো।

যদি পঁচিশ বছর পাকিস্তানী জালেমদের বিরুদ্ধে লড়তে পারি, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ থেকে আরম্ভ করে গোলাম মোহাম্মদ, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, আইয়ুব খান আর ইয়াহিয়া খান পর্যন্ত সবার সাথে বুক টান করে সংগ্রাম করতে পারি, ৩০ লক্ষ লোকের জীবন দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি, তাহলে দূর্ণীতি, ঘৃষখোরি, মুনাফাখোরি আর চোরাচালানও নিশ্চয়ই নির্মূল করতে পারবো। – আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, তোমরাও প্রতিজ্ঞা করো । বাংলাদেশের জনগণও প্রতিজ্ঞা করুক। আমার আর সহ্য করবার শক্তি নেই।

এসবের জন্যতো আমি জীবন-যৌবন নষ্ট করিনি। এসবের জন্য শহীদরা রক্ত দিয়ে যায়নি। পার করে দিয়ে আসে, জিনিসের দাম বাড়িয়ে দেয়। খাবার জিনিস গুদামে মজুদ করে মানুষকে না খাইয়ে মারে। তাদের উৎখাত করতে হবে বাংলাদেশের বুক থেকে । আমি দেখবো, তারা কি করতে পারে । এবার প্রমাণ হয়ে যাবে, চোরের শক্তি বেশী, না ইমানদারের শক্তি বেশী। অন্যায়ের কাছে আমি কোনদিন মাথা নত করিনি। বারবার পাকিস্তানীরা আমাকে ফীসি দিতে চেয়েছে।

কিন্তু আমি সব সময়ই বুক টান করে দীড়িয়ে থেকেছি। কারণ, আল্লাহ আমার সহায় ছিল। আমার জন্য বাংলাদেশের জনগণের দোয়া ছিল। এখনও সেই দোয়া আছে। তোমাদের সাহায্য, তোমাদের সহানুভূতি পেলে এবারও ইনশাআল্লাহ আমি জয়ী হবো। তোমাদের কাজ দেশের জনগণকে ভালবাসা । আর ইমানদার মানুষের সহযোগিতায় এই দুষ্কৃতকারীদের নির্মূল করতে হবে। আর এক দল মানুষ আছে, যারা বিদেশীদের অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ করতে চায়। তারা রাতের অন্ধকারে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে।

একটি লোক কেমন করে যে পয়সার লোভে মাতৃভূমিকে বিক্রি করতে পারে- তা ভাবলে আমি শিউরে উঠি। যারা বিদেশের আদর্শ বাংলাদেশে চালু করতে চায়, এদেশের মাটিতে তাদের স্থান হবে না। মনে রেখো, তোমাদের বাংলাদেশের মাটি থেকে তাদের শেষ করতে হবে। অজ্ঞানুবর্তিতা চাই আমার ছেলেরা, তোমরা আর একটি কথা মনে রেখো । জীবনে তোমরা যে কাজে নেমেছ, এটা তার জন্য জরুরী। ওপরের যারা তোমাদের হুকুম দেবেন, তাদের কথা মানতে হবে। এর জন্য তোমরা এখনই ওয়াদা করো ।

তোমরা যদি তাদের হুকুম না মানো, তোমাদের অধীনস্থ কেউ তোমাদের হুকুম মানবে না। এই জন্যই তোমাদের ওপরওয়ালার হুকুম মানতে হবে ।ধানমন্ত্রী হিসেবে একথা বলছি না, তোমাদের জাতির পিতা হিসাবে আদেশ দিচ্ছি- প্রধানমন্ত্রী অনেক হবেন, অনেক আসবেন, প্রেসিডেন্টও অনেক হবেন, অনেক আসবেন কিন্তু জাতির পিতা একবারই হন, দু’বার হন না। জাতির পিতা হিসেবেই যে আমি তোমাদের ভালবাসি, তা তোমরা জানো।

রি আমি তোমাদের আবার বলছি, তোমরা সৎ পথে থাকবে, মাতৃভূমিকে ভালবাসবে ।মনে রেখো, তোমাদের মধ্যে যেন পাকিস্তানী মনোভাব না আসে। তোমরা পাকিস্তানের সৈনিক নও, বাংলাদেশের সৈনিক। তোমরা হবে আমাদের জনগণের। তোমরা পেশাদার বাহিনী নও। কেবল সামরিক বাহিনীও নও। দরকার হলে তোমাদের আপন হাতে উৎপাদন করে খেয়ে বাচতে হবে।

এদিকে তোমাদের খেয়াল রাখা দরকার । আর তোমরা ন্যায়ের পক্ষে দীড়াবে। যেখানে অন্যায়:-অবিচার দেখবে, সেখানে চরম আঘাত হানবে । তোমরা যদি গুরুজনকে মেনে, শৃঙ্খলা রক্ষা করে সৎ পথে চলো, তাহলে জীবনে মানুষ হতে পারবে ।এসব কথা তোমাদের ভূললে চলবে না।

চোরাচালান বন্ধ করতে হবে

একটি বিষয়ে আমি আজ গর্বিত। সামরিক বাহিনীকে আমি চোরাচালান বন্ধ করবার হুকুম দিয়েছিলাম। পঁচিশ বছরে চোরাচালান বন্ধ হয়নি কিন্তু এবার আমার সামরিক বাহিনী, রক্ষী বাহিনীর সাহায্যে শতকরা ১৫ ভাগ চোরাচালান বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছি। জনগণের সাহায্য তোমাদের জন্য প্রয়োজন। কিন্তু জনগণ কারা? তোমাদের বাপ, তোমাদের ভাই। একথা তোমরা মনে রেখো ।

তোমাদের মাইনে কোথেকে আসে? বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের ট্যাক্স থেকে। এখানে যত সামরিক-বেসামরিক কর্মচারী আছেন, তাদের মাইনেও এই ট্যাক্স থেকে আসে। তোমরা সেই দুঃখী মানুষদের মালিক নও, সেবক। তাদের অর্থে তোমাদের সংসার চলবে। সুতরাং তাদের শ্রদ্ধা করতে ও ভালবাসতে শেখো। তোমরা অবশ্য অন্যায় দমন করবে কিন্তু খেয়াল রেখো, নিরপরাধ লোকের প্রতি যেন অন্যায় কিছু না হয়। তোমাদের জন্য আমার শুভেচ্ছা রইলো ।

 

১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫ সালের কুমিল্লায় সামরিক একাডেমীতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
১১ই জানুয়ারি ১৯৭৫ সালের কুমিল্লায় সামরিক একাডেমীতে প্রথম শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠানে বিদায়ী ক্যাডেটদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

সোনার বাংলা দেখতে চাই

আজ তোমরা কিছু বুঝতে পারবে কিনা আমি জানি না। আমার মনে যে আজ কি আনন্দ, তোমাদের আমি তা ভাষায় প্রকাশ করে বলতে পারবো না। যখন আমি আগরতলা মামলার বন্দি ছিলাম, যখন পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী জেলে বন্দি ছিলাম, তখন ভাবতে পারিনি যে, একদিন এখানে তোমাদের প্যারেড হবে । অবশ্য বাংলাদেশে সামরিক একাডেমী হবে, এ বিশ্বাস আমার ছিল কিন্ত আমি দেখে যাব, এটা আমি ভাবিনি ।

তবে আল্লাহ আমাকে দেখিয়েছেন । নর কিন্তু আমি আরও দেখতে চাই। আমি দেখতে চাই সোনার বাংলা । আমি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই । আমি আরও দেখতে চাই, এদেশের দুঃখী মানুষ পেট ভরে খেতে পাচ্ছে। তাদের গায়ে কাপড় আছে। “ অত্যাচার-অবিচার বন্ধ হয়ে গেছে। এইজন্য আজ আমি তোমাদের এই প্ল্যাটফর্ম থেকে সামরিক বাহিনী, বেসামরিক বাহিনী, জনগণ-সকলের কাছে আবেদন জানাবো, সবাই সংঘবদ্ধ হয়ে অভাব, অত্যাচার আর অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করুন।

দেশ গড়বার কাজে আত্মনিয়োগ করুন। কলে-কারখানায় কাজ করতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে হবে। কাজ করবো না, কিন্তু পয়সা নেব-এমন কথা বলা আর চলবে না। তিন বছর আমি এসব সহ্য করেছি, আর নয়। দেশের সম্পদ না বাড়লে দেশের মানুষ বাচতে পারে না।

সামরিক একাডেমীর ভবিষ্যৎ

আমি জানি, এই একাডেমীতে তোমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে। অনেক অসুবিধার মধ্যে তোমাদের ট্রেনিং নিতে হয়েছে। তোমাদের কমাপ্তাররা বহু কষ্ট করে তোমাদের ট্রেনিং দিয়েছেন কিন্ত একদিনে সব জিনিস হয় না। এখানে সামরিক বাহিনীর পুরোনো মানুষ যারা আছেন, তীদের জিজ্ঞাসা করো ৪৭ সালে বাংলাদেশে কি ছিল? সে যুগে আমাদের টাকা দিয়ে পাকিস্ত নে যে সামরিক একাডেমী হয়েছিল, তার অবস্থাই বা দশ বছর পর্যন্ত কি ছিল? করতে পেরেছি, সকলের জন্যই করতে পেরেছি। এরজন্য আমি আনন্দিত।

সামরিক একাডেমী একদিনে গড়ে ওঠে না। তারজন্য অনেক দিন লাগে, অনেক জিনিসের প্রয়োজন হয়। ইনশাল্লাহ সবই হবে এবং ভালভাবেই হবে । এমনভাবে হবে যে, আমার বিশ্বাস সারা দুনিয়ার মানুষ আমাদের এই একাডেমী দেখতে আসবে । তোমাদের জন্য আমার শুভেচ্ছা রইলো । আমার আদেশ রইলো আর রইলো আমার গ্নেহের আবেদন। আমি তোমাদের জন্য দোয়া করবো।

বাংলাদেশের জনগণ তোমাদের জন্য দোয়া করবে। তোমরা প্রথম দল। কাল থেকে তোমরা সামরিক অফিসার হয়ে যাবে। তোমরা আদর্শ সৃষ্ট করো, যাতে তোমাদের পরে যারা আসবে, তারাও যেন আদর্শবান হয়। তোমাদের ওপর আমার বিশ্বাস আছে। আমি তোমাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের চীফ অব স্টাফ আর কমাগ্ডারদেরও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ধন্যবাদ জানাচ্ছি তাদের, খারা ইনস্ট্রাক্টর ছিলেন এবং যারা সহযোগীতা করেছেন।

আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। এ স্বাধীনতা নিশ্চয়ই টিকে থাকবে । একে কেউ ধ্বংস করতে পারবে না । তবে, বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারলে এ স্বাধীনতা বৃথা হয়ে যাবে। এজন্য তোমাদের কাছে আমার আবেদন রইলো, তোমরা সৎ পথে থেকো। খোদা নিশ্চই তোমাদের সাহায্য করবে । এই কথা বলেই আমি বিদায় নিচ্ছি। খোদা হাফেজ

জয় বাংলা

Bangabandhu Gurukul
Bangabandhu Gurukul

 

আরও পরুন :

মন্তব্য করুন