১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ বাংলা একাডেমীতে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ বাংলা একাডেমীতে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণঃ মাননীয় সভাপতি, সম্মেলনে আগত বিদেশী অতিথিগণ, উপস্থিত কুটনৈতিক সুধীবৃন্দ এবং সমাগত সুধী মন্ডলী- শহীদ স্মৃতি বিজড়ীত পবিত্র ভাষা আন্দোলনের মহান ২১শে ফেব্রুয়ারী উপলক্ষে জাতীয় সাহিত্য-সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এই সম্মেলনে আমি প্রথমেই ২১শের ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের অমর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

 

১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ বাংলা একাডেমীতে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ বাংলা একাডেমীতে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪ বাংলা একাডেমীতে জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধনে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

বাংলাদেশের স্বাধিকার ও সার্বিক মুক্তির জন্য যারা আত্মহুতি দিয়েছেন, তাদেরকেও আজ আপনাদের সামনে দীড়িয়ে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। বন্ধুগণ, অমর একুশের কথা ভাবতে গেলেই আমার মনে অনেক স্মৃতি এসে ভীড় জমায়। যে বাংলা একাডেমির প্রানে আপনারা সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করেছেন, সেই বাংলা একাডেমি এদেশের দুর্জয় জনতার মাতৃভাষার সংগ্রামে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের জুলত্ত সাক্ষ্য বহণ করে, বহণ করছে। বাংলা ভাষার দাবীতে আমাদের আন্দোলন শুরু হয় ১৯৪৮ সালে, ১১ই মার্চ। সে দিনের স্বৈরাচারী সরকার আমাদের মাতৃভাষার দাবীকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য নির্মম নির্যাতনের আশ্রয় নিয়েছিল ।

কীদানো গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ, আহত হয়েছিল শত শত ছাত্র জনতা । এঁদিন সকালেই বিক্ষোভ মিছিল থেকে অন্যান্য সহকমীদের সাথে আমাকেও গ্রেফতার করা হয়। শুরু হয় নির্যাতন ও কারা যন্ত্রনা । কিন্ত কোন শক্তি কখনো সত্যের পক্ষ থেকে আমাকে নিভৃত করতে পারে নাই। যাই হউক, তারপর এল ৫২-এর সেই রক্তাক্ত ফানুন। তখন আমি জেলখানায়, জেল থেকে চিকিৎসার জন্য আমাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে জনৈক পুলিশ সাব-ইন্সিপেক্টরের সাহায্যে, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করি।

আমার সঙ্গে পরামর্শ করেই তারা ২১শে ফেব্রুয়ারীর আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেন এবং তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই আমি ১৬ই ফেব্রুয়ারী থেকে শুরু করি অনশন ধর্মঘট, সেই অনশন ধর্মঘট আমি চালিয়ে যাই ২৭শে ফেব্রুয়ারী পর্যস্ত। -আমার সেদিনের বন্ধুরা হয়ত সেটা আজও মনে করতে পারবেন.৷ আমাদের সেইদিনের সেই আন্দোলন জয়যুক্ত হয়েছিল। ২১শের রক্তরাঙ্গা পথ বেয়েই বাঙালী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এবং স্বাধিকার চেতনা ধীরে ধীরে এক দুর্বার গতি লাভ করে। স্বাধীনতার পর বাংলা একাডেমির উদ্যোগে, আমার দেশের শিল্পি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতি সেবীরা এই প্রথম একটি জাতীয় সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করছেন। এই মহতি প্রচেষ্টা যে খুবই সময়োপযোগী হয়েছে- তা বলাই বাহুল্য।

দীর্ঘকাল ব্যাগী নানা শোষণ এবং বঞ্চনার ফলে অর্থনৈতিক দিক থেকে আজ আমরা দরিদ্র, ক্ষুধার্ত নানা সমস্যায় জর্জরিত । এই অবস্থা কাটিয়ে উঠার জন্য আমরা অর্থনীতির মুক্তির সংগ্রাম এবং দেশ গড়ার কাজে লিপ্ত হয়েছি। কিন্তু সাহিত্য, সংস্কৃতি ও এঁতিহ্যের দিক থেকে আমরা দরিদ্র নই। আমাদের ভাষার দু’হাজার বছরের একটি গৌরবময় ইতিহাস আছে। সংস্কৃতি  এতিহ্য নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে ভাম্বর। আজকে স্বাধীন জাতি হিসাবে বিশ্বের দরবারে মাথা উচু করে দীড়াতে হলে আমাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও এঁতিহ্যের মর্যাদাকে দেশে ও বিদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে ।

Bangabandhu Gurukul

সৃধী বন্ধুরা আমার, মেহেনতী মানুষ, কৃষক-শ্রমিক এবং ছাত্র তরুণদের পাশাপাশি দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, সাহিত্য সেবিরা সক্রিয়ভাবে যোগ দিয়েছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন, রক্ত দিয়েছেন। বিশ্বের স্বাধীনতালবধ জাতিগুলির মধ্যে আমরা এদিক থেকে গর্ব করতে পারি যে, আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রাম হাতে হাত ধরে অগ্রসর হয়েছে । যখন দেশ স্বাধীন হয়েছে তখন সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংস্কৃতি সেবিদের কাছে আমার প্রত্যাশা আরোও অধিক । যারা সাহিত্য সাধনা করছেন, শিল্পের চর্চা করছেন, এঁতিহ্য ও সাংস্কৃতির সেবা করছেন, তাদেরকে দেশের জনগণরান সঙ্গে গভীর যোগসূত্র রক্ষা করিয়া অগ্রসর হতে হবে।

দেশের জনগণের চিন্তা ভাবনা, আনন্দ-বেদনা এবং সামশ্ত্রীক অর্থে তাদের জীবন প্রবাহ আমাদের সাহিত্যে ও শিল্পে অবশ্যই ফুটিয়ে তুলতে হবে। সাহিত্যে ও শিল্পে ফুটিয়ে তুলতে হবে এদেশের দুগী মানুষের আনন্দ বেদনার কথা, সাজানো হবে তাদের কল্যাণ । আজ আমআদের রন্দ্রে রন্দ্রে যে দুর্গীতীর শাখা- প্রশাখা বিস্তার করেছে, আপনাদের লেখনির মাধ্যমে তার মুখোশ তুলে ধরুন। দুর্গীতীর মূলউৎপাটনে সরকারকে সাহায্য করুন। আমি সাহিত্যিক নই, শিল্পী নই, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি যে, জনগণই সব সাহিত্য ও শিল্পের উৎ্স।

জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনখানে কোন মহত সাহিত্য বা উন্নত শিল্পকর্ম সৃষ্টি হতে পারে না। আমি সারা জীবন জনগণের সাথে নিয়ে সংগ্রাম করেছি, এখনও করছি, ভবিষ্যতে যা কিছু করব জনগণকে নিয়েই করব। সুধী বন্ধুরা, আপনাদের কাছে আমার আবেদন- আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি যেন শুধু শহরের পাকা দালানেই আবদ্ধ হয়ে না থকে। লাদেশের গ্রাম-গামান্তরের কোটি কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দনও তাতে প্রতিফলিত হয়। আজকের সাহিত্য সম্মেলনে যদি এসবের সঠিক মূল্যায়ন হয়_ তবে আমি সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হব।

সুধী মন্তলী, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে আজ সমস্যার অন্ত নাই। আমাদের আর্থিক অনটন আছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রের সমস্যার দুঃসহ অভাব আছে। কিন্ত আমি মনে করি সবকিছুর উর্ধে আমাদের মূল্যবোধের অভাবই আজ সবচেয়ে পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। এই অভাব জাতীয় জীবনে যে সংকট সৃষ্টি করেছে_ তা অবিলম্বে রোধ করা দরকার । আমি বিশ্বাস করি দেশের সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংস্কৃতিকসেবি, শিক্ষাব্রতী, বুদ্ধিজীবিরা এই সংকট উত্তরণে এবং জাতীয় মূল্যবোধে উজ্জীপনে সুকোমল ভিত্তির বিকাশে গুরুতৃপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন ।

আজকে সময় এসেছে যেন প্রত্যেক আত্মবিশ্লেষণ করে দেখতে হবে নিজের নিজের ক্ষেত্রে তার এদেশের কল্যান, কল্যানে তাদের দায়িত্ব ভূমিকা কতটা আন্ত রিকভাবে পালন করেছেন। দেশ ও জাতি আজ তাদের নিকট এই দাবী ম়। একটি সুষ্ঠ জাতি গঠনে শিল্প, কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা অন্যান্য সর্বক্ষেত্রে যেমন উন্নয়ন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন চিন্তা ও চেতনার ক্ষেত্রে বৈপ্রবিক পরিবর্তন সাধন করা । আমি সর্বত্রই এই কথা বলি, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। সোনার মানুষ আকাশ থেকে পড়বে না, মাটি থেকেও গজাবেনা, এই বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্য থেকেই তাদেরকে সৃষ্টি করতে হবে । নবতর চিন্তা, চেতনা ও মূল্যবোধের মধ্যমেই সেই নতুন মানুষ সৃষ্টি সম্ভব ।

মানবতার সুদক্ষ প্রকৌশলী, দেশের সুধী, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাব্রতী, বুদ্ধিজীবি ও সাংস্কৃতিসেবি, আমি আজকের এই সাহিত্য সম্মেলনে উদ্যত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। এই সম্মেলনে বন্ধু রাষ্ট্র সমূহ থেকে অতিথি হিসাবে যারা যোগ দিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যারা এখানে সমবেত হয়েছেন, তাদের সবাইকে শুভ কামনা জানাচ্ছি। আমি এই সম্মেলনের সাফল্য কামনা করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্মেলন উদ্বোধন করছি। জয় বাংলা ।

 

Bangabandhu Gurukul

 

আরও পরুন :

মন্তব্য করুন