১৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালের জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ | বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনের প্রথম বৈঠক

১৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালের জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণঃ মঙ্গলবার, সকাল ১১-১০ মিনিটে স্পীকার জনাব মুহম্মদুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনের প্রথম বৈঠক

শৌক-প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  (প্রধানমন্ত্রি)ঃ জনাব স্পীকার সাহেব, মোতাহার উদ্দীন সাহেব আততায়ীর গুলিতে আত্মাহুতি দিয়েছেন। আজ আমাদের একজন সহকর্মী এবং এই পার্লামেন্টের সদস্য জীবন দিয়েছেন। সেজন্য আমরা শোক প্রস্তাব পাস করছি। মোতাহার উদ্দীন সাহেবকে আমি বহুকাল থেকে জানি, অনেক পুরোনো সহকর্মী। আওয়ামীলীগের সৃষ্ট থেকেই তিনি আওয়ামীলীগের সাথে জড়িত ছিলেন।

 

১৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালের জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ | বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনের প্রথম বৈঠক
১৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালের জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ | বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনের প্রথম বৈঠক

 

১৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালের জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ | বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনের প্রথম বৈঠক

 

তিনি একজন নিঃস্বার্থ কর্মী ছিলেন। তিনি স্কুলের শিক্ষকতা করতেন এবং গ্রামে থাকতেন। স্বাধীনতা  সংগ্রামে তিনি নিজে যুদ্ধ করেছেন। বর্বর পাক-বাহিনী তার বাড়ি- ঘর সবই জ্বালিয়ে দিয়েছে। তিনি উভয় নির্বাচনেই প্রতিদ্বন্দিতায় তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন । আগেও সদস্য ছিলেন, এবারেও বিনা প্রতিদবন্দিতায় তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

তাতেই বুঝতে পারেন তাঁর এলাকায় তিনি কত পপুলার ছিলেন। কিছুদিন পূর্বে সাইক্লোনের সময় আমি তার এলাকায় গিয়েছিলাম । লক্ষ লক্ষ লোক সেখানে জমায়েত হয়েছিল। মানুষ যে তাকে কত ভালবাসে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। দেশে আজকাল একটা জিনিস দেখা দিয়েছে, যা বাংলার মাটিতে আগে ছিল না। এখন দেখা যাচ্ছে রাতের অন্ধকারে গুপ্তঘাতক সেজে রাজনৈতিক কর্মীদের এবং পার্লামেন্টের সদস্যদের হত্যা করা হচ্ছে। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। জনসাধারণকে আমরা গণতান্ত্রিক অধিকার দিয়েছি । জনগণের মতামতের উপর বিশ্বাস রাখি। জনগণ যাদের নির্বাচিত করবে, তারাই সরকার চালাবে । কিন্তু যারা আজ

গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে গপ্তহত্যার পন্থা অবলম্বন করছে, তাদের রাজনীতি করবার অধিকার বাংলাদেশে আছে কি না, তা আজ একথা আমি পরিষ্কার ভাষায় জানাতে চাই, যে যারা বলছে বিপ্লব করব, অস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা করব, তাদের এসব বলার অধিকার আছে কি.না-তা ভাববার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনগণ দুর্বল নয়, সরকারও দুর্বল নয়। কিন্তু একটা আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমাদের অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছে এবং এখনও সহ্য করছি। একটা দেশের System কে নষ্ট করার জন্য তারা যদি এইভাবে কাজ করতে থাকে, তারা একজন লীডারকে মেরে একটা systemপরিবর্তন করা যায় না।

দুই- একজনকে হত্যা করলেই রাষ্ট্র ধ্বংস করা যায় না। একটা রাষ্ট্রের সরকারের পতন ঘটানো যায় না। এ কথা তাদের জানা আছে। তা জেনে শুনেই তারা এ-কাজ করছে। তারা জানে জনগণ তাদের পিছনে নেই। ভোটের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় আসতে পারবে না, তাদের সমর্থন নাই। তাই তারা এ পন্থা অবলম্বন করেছে। জনাব স্পীকার সাহেব, এ ব্যাপারে সরকারের কর্তব্য রয়েছে। যথেষ্ট ধৈর্য, যথেষ্ট সহিষ্ণুতা সরকারের পক্ষ থেকে আমরা দেখিয়েছি, জনগণও দেখিয়েছে, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামীলীগও দেখিয়েছে, অন্যান্য অনেক দলও দেখিয়েছে।

কিন্তু কিছু সংখ্যক দল ও প্রতিষ্ঠান আছে, যারা দেশের মধ্যে বিশৃংখলা সৃষ্টির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। তারা নিরপরাধ গ্রামের লোককে হত্যা করে চলেছে। কিছুদিন আগে মানিকগঞ্জে একজন চেয়ারম্যানকে হত্যা করা হয়েছে। এই সেদিন বরিশালে হত্যা করা হয়েছে। এই সমস্ত হত্যাকাণ্ড চলছে। কিন্তু যারা এসব করছে তাদের থেফতার করা হলে তাদের ধরা হলে বলা হয় আমাদের গণতন্ত্র নষ্ট হয়ে গেল। আমাদের অধিকার নষ্ট হয়ে গেল। আমাদের সবকিছু নষ্ট হয়ে গেল। তাদের যে এসব করার অধিকার নাই, এ-কথা আমি পরিষ্কার করে জানাতে চাই জনাব স্পীকার সাহেব ।

 

১৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালের জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ | বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনের প্রথম বৈঠক
১৫ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালের জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ | বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনের প্রথম বৈঠক

 

এসব অধিকার চলবে কি না তা ভাববার কথা । কেননা এ বিষয়ে আমাদের একটা responsibility রয়েছে। দেশের জনগণ এসমস্ত কোনমতেই allow করতে পারে না।জনগণকে কেউ অস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা করতে পারে না। কোন সভ্য দেশের সরকার এটা করতে দিতে পারে না। তাই কেউ যদি বলে এটা করব, সশস্ত্রভাবে এটা করব। এটার মধ্যে এটা করব, অস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা করব। তবে আমরা জানি বাংলাদেশে এক মিনিটের জন্য সে-রকম করার ক্ষমতা কারো নেই। এ-কথা বলা শুধু বাহাদুরি দেখানো এবং দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা ছাড়া আর কিছু নয়।

আমরা সহ্য করেছি। কিন্তু সহ্যেরও সীমা আছে। এখানে জনগণ যখন পাঁচ বছরের জন্য শতকরা ৯৭ ভাগ ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িতু আমাদের দিয়েছে, তখন জনগণের সুখ শান্তি দেখার ক্ষমতা আমাদের রয়েছে। আপনারা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিদন্ৰিতা করে যদি আসতে পারেন, তবে নিশ্চই আমরা আপনাদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেব। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমরা বিশ্বাস করি।কিন্ত গণতন্ত্রের নামে, ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে অস্ত্র যোগাড় করে রাতে অন্ধকারে খুন করে ধরা পড়লে চিত্কার করার অধিকার দেওয়া আর সম্ভবপর নয়।

অত্যন্ত দুখের সাথে বলতে হয় যে, এ পর্যন্ত আমাদের অনেক কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। শুধু আমাদের মোতাহারকেই হত্যা করা হয়নি। পাকিস্তানী দস্যুরা আমাদের আওয়ামী লীগের মে্বার, গণপরিষদ সদস্য মশিয়ুর রহমান, আমিন উদ্দিনকে হত্যা করেছে। পাকিস্তানী বর্বররা আমাদের নজমুলকে হত্যা করেছে, আমজাদকে হত্যা করেছে। আরো অনেক এমপিকে হত্যা করেছে, অনেক লীডারকে হত্যা করেছে। নুরুল হক পার্লামেন্টের মেম্বার ছিল। খুলনার আবদুল গফুরকে, বরিশালের সগীরকে হত্যা করেছে, আর মোতাহারকে হত্যা করল ।

আমরা শোক প্রস্তাব পাস করছি, প্রস্তাবের প্রতিলিপি পাঠাচ্ছি এবং শোক প্রকাশ করছি।কিন্তু মানুষ মরণশীল, একদিন সবাইকেই মরতে হবে । আমরা বিগত ২৫ বছর যাবৎ রাজনীতি করছি, পাকিস্তানের আমলে সংগ্রাম করেছি। আওয়ামীলীগ বড় বড় ফিল্ড মার্শাল এবং মার্শালদের সাথে সংগ্রাম করেছে। ২৫ বছরের ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। কিন্তু people memory is short something .গত ২৫ বছরে আওয়ামীলীগ কোন বেঈমানী করেছে বলে অন্তত আমার জানা নাই। সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য যে কোন বাধার মোকাবিলা আমরা করেছি, যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করেছি, অত্যাচার সহ্য করেছি।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, আজ সরকার আওয়ামীলীগের বলে, বজবন্ধু প্রধানমন্ত্রী বলে আওয়ামীলীগের কমীদের রাতের অন্ধকারে হত্যা করা হচ্ছে । তা না হলে বাংলাদেশে আওয়ামীলীগের মেম্বারদের গায়ে যে কেউ হাত তুলতে পারে না। তা বোধ হয় তাদের জানা নেই।

মাগফেরাৎ কামনা করছি। যে আদর্শের জন্য তিনি ত্যাগ স্বীকার করলেন, সেই আদর্শ অবলম্বন করে আমরা যদি বাংলাদেশের মানুষের জন্য সুখী সংসার গড়ে তুলতে পারি, তাদের দুঃখ দূর করতে পারি, সেই সংায়ী আদর্শকে যদি আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলেই তীর জীবন দেওয়া স্বার্বক হবে। এই খ্যাসেম্বলীর সদস্যদের পক্ষ থেকে আপনি যে শোক প্রস্তাব এনেছেন, তা আমি সমর্থন করে আপনার মাধ্যমে শোক-সন্তপ্ত পরিবার পরিজনকে সমবেদনা জানাচ্ছি।

জনাব স্পীকার সাহেব, আশা করি ভবিষ্যতে এরকম দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না এবং আমি আরও আশা করব যে, যারা এই পথ অবলম্বন করেছে, তারা এই পথ ত্যাগ করবে এবং গণতান্ত্রিক পথ অবলম্বন করবে।এই কথা বলে আমি বিদায় নিচ্ছি। বাংলাদেশ ইহার একজন সুসন্তান, নিঃস্বা সমাজকর্মী ও জনদরদী নেতা হারাইয়াছে। এই সংসদ মরহুমের আত্মার সদৃগতি কামনা করিতেছে এবং তার শোক-সন্তপ্ত পরিবারের নিকট গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করিতেছে।

এক্ষণে আমি মাননীয় সদস্যগণকে অনুরোধ করব_ তীরা যেন নীরবে দুই মিনিট দাঁড়িয়ে মরহুম মোঃ মোতাহার উদ্দীনের আত্মার শান্তির জন্য পরম করুণাময়ের নিকট মোনাজাত করেন । জৈনাব স্পীকার এবং মাননীয় সংসদ-সদস্যগণ দুই মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করেন) এখন আপনারা বসুন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  ঃ জনাব  স্পিকার বরবর পাকিস্তান বাহিনী’  যাদের হত্যা করেছে, তাদের আরেক জনের নাম ডাঃ জিকরুল হক।

 

Bangabandhu Gurukul

 

আরও পরুন :

 

মন্তব্য করুন