১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণঃ প্রিয় দেশবাসী ভাই ও বোনেরা, আপনারা আমার সালাম গ্রহণ করুণ । আজ আমি দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে আপনাদের সামনে দীড়িয়েছি। অনেক জেলা আজ বন্যা কবলিত। ঘরে ঘরে আজ বন্যা কবলিত ভাই-বোনদের হাহাকার । আমার দুঃখি মানুষের ঘর-বাড়ি, ক্ষেত-খামার, গরু-ছাগল, হাস- মুরগী সব বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। অনেকে বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছেন। যারা বেঁচে আছেন, তারা একটু আশ্রয়, একমুঠো অন্যের আশায় আজ দীড়িয়ে আছেন।

 

১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

তাতেই আমার মনে পড়ে গেছে। যারা মারা গেছেন তাদের পরিবার ও পরিজনকে সান্তনা দেবার ভাষা আমার নেই । যারা বেঁচে আছেন তাদের যে কোন মুল্যে এই বন্যার ছোবল থেকে বাচাতে হবে। এবারের বন্যা এক মহাজাতীয় দুর্যোগ । কিন্তু এই দূর্যোগ যত বড়ই হউক তাকে সাহসের সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। অতীতে আমার ডাকে আপনারা যেমন সাহসের সঙ্গে বড় বড় বিপদের মোকাবেলা করেছেন, এবারও তেমনি এঁক্যবদ্ধভাবে বিপদের মোকাবেলা করবেন, এটাই আমার একান্ত কামনা ।

বন্ধুগণ, এবারের বন্যার ভয়াবহ বিপদের কথা আমি আপনাদের কাছে ব্যাখ্যা করতে চাই না। আপনারা প্রত্যেকেই এই বিপদের ভুক্তভোগী । এই ভয়ংকর বিপদের সময় যদিও আমরা এখনও জরুরী অবস্থা ঘোষণা করি নাই, তবুও একই, এখন জরুরী অবস্থাই । জরুরী অবস্থা মোকাবেলা করার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের সমস্ত গুন, সামর্থের সবটুকু আমরা বন্যা দুর্ঘতের সাহায্যের কাজে লাগিয়েছি। সমস্যা যে বিরাট- তা আপনাদের কাছে বলার অপেক্ষা রাখে না। রাস্তা, ঘরবাড়ি সবকিছু ডুবে গেছে। কোথাও সাহায্য পৌঁছাবো এমন উপায় নাই।

বিমান বা হেলিকপ্টারে করে খাদ্য পৌছিয়ে দিলেও তা রাখার মতন গুদাম নাই। অধিকাংশ জায়গায় গুদাম ঘরে পানি ঢুকেছে। বন্যা দূর্গত মানুষ একফোটা খাবার পানি পাবে, তার উপায় নাই। গ্রামাঞ্চলে টিউবওয়েল ডুবে গেছে। স্কুল, কলেজ, ঘর-বাড়ি, ভাকঘর, থানা কোন কিছুই বন্যার ছোবল থেকে রক্ষা পায় নাই। তবুও আমরা হতাশ হই নাই। প্রেন-হেলিকপ্টার দিয়ে যতটা সম্ভব খাদ্য নিক্ষেপ ও….অভিযান চলেছে। রর নৌকা, স্টিমার, গাদাবোট, ওয়াগন, সবকিছু আজ নিয়োগ করা হয়েছে দুর্ঘত এলাকায় খাদ্য ও রিলিফ পাঠাবার কাজে ।

পরিক্ষিত কর্মীবাহিনী সেবার কাজে নেমে পড়েছেন। একটা মানুষের পক্ষে যা সম্ভব আমরা তার চেষ্টা করেছি। আপনাদের কাছে আমার আবেদন- আপনারা আমাদের কাজে সাহায্য এবং সহযোগিতা করুন। যে যা পারেন তাই নিয়ে বিপন্ন দেশবাসীর পাশে এসে দীড়ান। বন্যার রূপ ধরে যে বিরাট জাতীয় দুর্যোগ আমাদের সামনে উপস্থিত। তাকে আপনাদের কাছে ছোট করে দেখাতে আমি চাই না। বন্যা নেমে এলে বিপদ রয়েছে। কারণ, বন্যায় এবারের সকল ফসল প্রায় ধ্বংস প্রাপ্ত, বিপদের পর বিপদ। শুধু আমি আপনাদের কাছে আবেদন জানাই- ধৈর্য ধারণ করুন, সাহস হারাবেন না।

এই বিপদে হতাশ না হয়ে দৃঢ় মনোবল নিয়ে যে কোন অবস্থা মোকাবেলার জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে। অতীতে আমার ডাকে আপনারা বহুবার সংগ্রামে নেমেছেন। এই সংগ্রাম থেকে আমরা একটা শিক্ষাই পেয়েছি যে, বিপদকে মোকাবেলা করাই আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র পথ । ভাইয়েরা আমার, স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকে আমরা একটা নয় অনেক বিপদের মোকাবেলা করেছি। পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে বাংলাদেশ ধ্বংসপ্রাপ্ত । দেশ গড়ে তোলার কাজ শেষ না করতেই দেখা গিয়েছিল খাদ্যের অভাব ও মুদ্রাস্ফীতি

অনেকে বিদেশী পত্রিকায় বলেছিলেন, বাংলাদেশ এত বিপদের ধাক্কা সামলাতে পারবে না। দুর্ভিক্ষে লাখো লাখো লোক….। যাক ও আপনারা জানেন, এ দুর্ভিক্ষ আমরা সাধ্যমত মোকাবেলা করেছি। খাদ্যের অভাবের পর সাইক্লোন, সামুদ্রিক জলোচ্ছাস, বার বার স্থানীয় ভাবে বন্যা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে তেল সংকট । তেল সংকটের ফলে দুনিয়ায় যত উন্নত দেশ ছিল উৎপাদান ব্যাহত হয়েছে এবং জিনিস পত্রের দাম হুর হুর করে বেড়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির ধাক্কা বাংলাদেশের গায়ে এসে লেগেছিল।

আমি জানিনা পৃথিবীর আর কোন নব্য স্বাধীন গরীব দেশ আমাদের মত একটার পর একটা এত বিপদ একসঙ্গে সামাল দিতে পেরেছে কিনা, আমি জানিনা । আপনাদের সহযোগিতার বলে বলিয়ান হয়ে অনেক বিপদ কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করেছি। কিছুটা সফলও হয়েছিলাম কিন্তু এই ভয়াবহ বন্যা আমাদের সব প্রান, প্রোগ্রাম, গঠনমূলক কাজ বানচাল করে দিয়েছে। স্বাধীনতার পরের ৩২ মাসে আমরা যতটা এগিয়ে ছিলাম, এই বন্যা আমাদের ততটা পিছিয়ে দিয়েছে । তবুও আমি বলব আপনারা হতাশ হবেন না।

 

১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় আপনারা যেমন আমার ডাকে আন্তরিকভাবে সাড়া দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন, আজও তেমনি এগিয়ে আসুন এই বিপদ মোকাবেলার জন্য । আমরা যদি এঁক্যবদ্ধভাবে কাজ করি_ তাহলে বিপদ যত বিরাট হউক ইনশাআল্লাহ আমরা তাকে কাটিয়ে উঠতে পারব । দেশবাসী ভাই বোনেরা, আপনারা জানেন আমি মিথ্যা ওয়াদা করার লোক নই। ক্ষমতার রাজনীতি আমি করি না। মিথ্যা প্রতিশ্র্তি আমি কাউকে দেই না। তাই স্বাধীনতার পর আমি আপনাদের কাছে তিন বৎসর সময় চেয়েছিলাম ।

আমাদের সামনে তখন ছিল প্রায় পাহাড় সমান সমস্যা । পাকিস্তানিরা বাংলাদেশকে একটা বাজার হিসাবে ব্যবহার করেছে। সব জিনিস আমাদের আমদানী করতে হয়। গত স্বাধীনতার পরে আমাদের সরকারি তহবিল ছিল শুন্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুই ছিল না। কল- কারখানা ছিল অচল, রাস্তা-ঘাট-বিজ ছিল ভাঙ্জা। আজ যে ভয়াবহ বন্যা বাংলাদেশকে ধ্বংসগ্রস্ত করেছে_ তাও ২৫ বছরের অবহেলার ফল। আপনারা জানেন অতীতে বাংলাদেশে ঝড়-বন্যায় হাজার হাজার লোক মারা গেলেও পাকিস্তানি শাসকরা বলতেন এটা ন্যাচারাল ক্লাইমেট, প্রাকৃতিক দূর্যোগ ।

আমরা কি করবঃ আসলে ২৫ বছরে তারা কিছুই করে নাই। পাকিস্তানের হাজার হাজার কোটি -টাকা ব্যয় করে, ওপারটা…., গোলাম মোঃ বীধ বেঁধেছিলেন, সিন্ধু অববাহিকায় নতুন নতুন বাধ হয়েছে। বাংলাদেশে বন্যা নিয়ন্ত্রনে কোন ব্যবস্থাই হয় নাই। এমনকি….. কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী কাজ করা হয় নাই। ২৭ বৎসরে বন্যা সমস্যা আরো জটিল হয়ে দীড়িয়েছে। এখন বিপুল অর্থ ও আন্তর্জাতিক সাহায্য ছাড়া এ সমস্যার মোকাবেলা করা সম্ভবপর নয়। স্বাধীনতা লাভের পর মাত্র ৩২ মাসে একটা গরীব দেশের নানা ধরণের সমস্যা সমাধান করা সম্ভবপর নয়।

আপনারাই বিবেচনা করুন, আমরা চেষ্টার ক্রুটি করি নাই। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ৩২ মাসের মধ্যে বিশ্বের ১২৬টি দেশের স্বীকৃতি আমরা পেয়েছি, জাতিসংঘেরও আমরা আসন লাভ করতে চলেছি। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগে আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটা স্থিতিশীল হয়ে এসেছিল। আমরা আশা করেছিলাম নতুন কোন বিপদ না এলে খাদ্য ফলাও, খাদ্য সংঘহ অভিযান শুরু করব। আমরা সরকারি গুদামে যথেষ্ট খাদ্য মজুদ রাখতে পারব। কিন্তু এ সময় ঝড়-বন্যায় বারবার ছোবল, এলো মধ্যপাচ্যের যুদ্ধ, এই যুদ্ধে আমরা আরো বাইরের সাহায্যে এগিয়ে গিয়েছিলাম ।

কিন্তু তৈল সংকটের ধাক্কা থেকে আমরা রেহাই পাই নাই। তৈল সংকটের ফলে, একদিকে জিনিস পত্রের দাম বেড়েছে, অন্যদিকে আমাদের অর্থনীতির উপর পড়েছে ভয়াবহ চাপ। এ চাপ সামাল দিতে না দিতেই এসেছে সর্বনাশা বন্যা । বলতে গেলে আবার আমরা চারদিক থেকে অনেকগুলি বিপদের সম্মুখীন হয়েছি। এ বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে সমস্ত শক্তি নিয়ে আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। দেশকে যারা ভালোবাসেন তাদের সকলের কাছে আজ আমার আবেদন এগিয়ে আসুন। বিপন্ন মানবতা আপনাদের ডাকছে, তাদের ডাকে আমাদের সকলের সাড়া দেওয়া কর্তব্য ।

ভাই ও বোনেরা, সমস্যা আমাদের একটা নয় অনেক। অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ শক্ররাও আমাদের কম ক্ষতি করে নাই। গত তৎপরতায় আমরা পারি নাই। একথা স্বীকার করতে আমার লজ্জা নাই। সরকারি উদারতাকে দুর্বল মনে করে, ঘুষখোর, দূর্ণীতি পরায়ন ব্যক্তিরা, কালো বাজারী, চোরা কারবারিরা এ দেশের দুঃখি মানুষের দুঃখ আরো বাড়িয়েছে। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বে- সামরিক, প্রশাসনিক সব বাহিনীগুলোর সমন্বিত অভিযানে আমরা যথেষ্ট ফলও পেয়েছিলাম ।

সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফায়ারিং স্কোয়াডের ব্যবস্থা করে সমাজ থেকে নির্মূল করার দৃঢ় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেশের নুন্যতম জনতার অসহায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে মানবতার জগন্য শত্র এই সমান্দোহীরা যাতে আবার মাথা চারা দিয়ে না উঠতে পারে, সেইদিকে আমাদের সকলে নজর দেওয়া কর্তব্য। সারা দেশের মানুষের দুর্দশা লাঘবের জন্য মানুষের যতটুকু সাধ্য আমরা তা চেষ্টা করছি। আমাদের এই চেষ্টায় আপনাদের পূর্ণ সহযোগিতা দরকার । আমার বিশ্বাস এবারও আপনারা আমার আবেদনে সাড়া দিয়ে বিপন্ন মানবতার সেবায় এগিয়ে আসবেন । পরস্পরের দোষ না খুঁজে- আসুন, আমরা পরস্পরকে সাহায্য করি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শত্রুর কামানের গর্জনকে আমরা ভয় পাই নাই।

এবারও ঝড় ও বন্যায় বিপদ থেকে আমরা হতাশ হব না। এই দারুন দুর্দিনে আমরা যদি এক্যবদ্ধ থাকি, তো পরস্পরকে সাহায্য করি, তাহলে আমাদের কোন বিপদ জাতীয় এঁক্যকে ধ্বংস করতে পারবে না। অতীতে আমরা পরাজিত হই নাই। ইনশাআল্লাহ বর্তমানে আমরা পরাজিত হব না। আমার প্রিয় দেশবাসী, আমি জানি আজ আপনারা নানা সংকটে জর্জরিত। জিনিস-পত্রের দাম অসম্ভব বাড়ার ফলে আপনারা কষ্ট পাচ্ছেন। বন্যা কবলিত এলাকার ভাই-বোনেরা আমি জানি, আপনারা কি নিদারুন দুঃখ ও কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

কি দুঃসহ পরম করুন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আপনাদের প্রতিদিন, প্রতিটি দিন অতিবাহিত হচ্ছে তাও আমার অজানা নয়। আল্লাহ আপনাদের সবুর করার শক্তি দান করুন। তবে তা নিশ্চিন্তে থাকুন, আমি আপনাদের পাশে রয়েছি। যখন সরকারে ছিলাম না তখনও আমি আপনাদের পাশে দীড়িয়েছি। আজও আপনাদের পাশে আছি। দেশ-বিদেশ যেখান থেকে যতটুকু এনে মানুষের পক্ষে করা সম্ভব তার কোন তক্রটিই আমি করব না। আজ শুধু বাংলাদেশে নয় পৃথিবীর সব দেশে জিনিস পত্রের দাম বেড়েছে। এই দাম বাড়ার হিড়িকে উন্নত দেশগুলির জনগণের জীবনও আজ বিড়ম্বিত। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর পৃথিবীব্যাপী শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় ।

আমরা আমদানীকারী দেশ। জিনিস বিদেশ থেকে আমাদের আমদানী করতে হয়। এই অবস্থায় বিশ্ব বাজারে দাম বাড়ার ধাক্কা আমাদের অর্থনীতিতে প্রচন্ড আঘাত হেনেছে । আমি আপনাদের কাছে বিশ্ব বাজারের দাম বাড়ার একটা তুলনামূলক হিসাব দিচ্ছি। ১৯৭১ সালে সিমেন্টের আন্তর্জাতিক দাম ছিল প্রতি…..প্রায় কুড়ি ডলার । অর্থাৎ প্রায় ১৬০ টাকা । ১৯৭৪ সালে তা হয়েছে প্রায় ৭০ ডলার, মানি ৫৬০ টাকা। ১৯৭১ সালে প্রতিটন চাউলের দাম ছিল প্রায় ১২০ ডলার, ৯৬০ টকা । এখন তা প্রায় ৪৫০ ডলার মানি ৩৬০০ টাকা । খাবার তেলের দাম ছিল প্রতি টন প্রায় ৩৫০ ডলার তার অর্থ প্রায় ২৮০০ টাকা; এখন তা প্রায় ৯০০ ডলার অর্থাৎ ৭২০০ টাকা ।

 

১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

পেট্রোলের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল দেড় থেকে তিন ডলার ১৮ থেকে ২৪ টাকা, এখন তা হয়েছে ৯১ থেকে ১৭ ডলার, তার মানে ৮৮ থেকে ১২৬ টাকা । জাহাজের ভাড়া শতকরা ৫০% থেকে ৬০% বেড়ে গেছে। এই যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের অবস্থা, সেখানে বাংলাদেশের মত একটি নব্য স্বাধীন দরিদ্র দেশের অবস্থা কি দীড়ায় আপনারাই এখন ভেবে দেখুন। মাত্র ৩২ মাসে শতভাগ সমস্যা সমাধানের কোন যাদুমন্ত্র আমার কাছে নাই এবং সহজ রাস্তাও নাই। আজ আমাদের সামনে বাচার একমাত্র পথ ..সকলকেই কাজ করতে হবে।

সমাজ শত্রুদের রুখে দীড়াতে হবে। অর্থহীন সমালোচনা করে সমস্যার সমাধান হবে না। আসুন আমরা সমালোচনা ছেড়ে আজ কাজ করি, প্রত্যেকেই নিজ নিজ দায়িত্বে কাজ করি। বনুগণ, আজ আমার মন দুঃখ ও বেদনায় রা বন্যার পানিতে ১৭টি জেলা ভুবেছে। বন্যা দুর্ঘত এলাকা দেখতে গিয়ে আমি দেখেছি মানুষের দুঃখ দুর্দশার অন্ত নাই। এই ১৭টি বিপন্ন মানুষের একটু আশ্রয়ের ব্যবস্থা” একমুঠো অন্নের ব্যবস্থা এবং বন্যা শেষ হলে এদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যে কত কষ্টকর-_ তা আপনারা নিজেরাই বিবেচনা করতে পারেন।

তবে আমরা নিশ্চয়ই চেষ্টা করব এবং আমাদের কেউ ডিস্টার্ব না করে। এই বিপন্ন মানুষকে রক্ষা করা কি বিরাট  দায়িত্বের কাজ তা আপনারা ভালোভাবেই জানেন। এই কাজে জনগণের এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ দরকার । বন্যা দুর্গতদের সাহায্যের জন্য সরকার সদস্যতো নিয়োগ করেছেন, নগদ অর্থ সাহায্য ছাড়াও ওঁধধ, তৈরি খাবার, কাপড় দুর্গত লোকদের বিতরণ করা শুরু হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় এ সাহায্য খবৰ কম, তাও আমি জানি। দেশ-বিদেশ থেকে সাহায্য সংগ্রহের অভিযান চালিয়ে যাচ্ছি।

প্রত্যেকটি আশ্রয় শিবিরে যথেষ্ট সেবা দেবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বন্যার পর চাষি ভাইয়েরা যাতে তাড়াতাড়ি আবার ধান বুনে ফসল করতে পারেন_ সেজন্য আমরা বিশেষ ত্রান তহবিল থেকে সাহায্য দিয়েছি’ দরকার হলে আরো দেয়া হবে। মহামারি রোধে উষধ, মেডিক্যাল টিমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাদ্যের অভাব মোকাবেলার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কয়েকটি আন্ত র্জীতিক প্রতিষ্ঠান আমাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছেন। বিপন্ন মানুষকে রক্ষা করার জন্য অনেকেই আমার ত্রান তহবিলে মুক্ত হস্তে অর্থ সাহায্য করেছেন। বাহিরের দুনিয়ার কাছ থেকেও বিশেষ সাড়া পাওয়ার আশা আমি রাখি ।

বাংলাদেশের দুঃখ বিপদের দিনে জাতিসংঘসহ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিলেন । বিপন্ন মানুষের রক্ষায় এবং মানবতার সাহয্যে এরার তারা এগিয়ে আসবেন এ-আশা এবং এ-বিশ্বাস আমি করতে পারি । দেশবাসী ভাই ও বোনেরা, একটি কথা আজ আমি পরিস্কার ভাষায় বলতে চাই, জনগণের দুর্দশাকে মূলধন করে যারা মুনাফা লুটে- সেই ঘুষখোর, দুর্ণীতিবাজ, চোরাকারবার, মজুতদার ব্যবসায়ীদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে হবে। রিলিফ বন্টন নিয়ে কোন ছিনিমিনি খেলা বরদাস্ত করা হবে না।

ক্ষুধার্থ মানুষের গ্রাস যারা কেড়ে নেয়, তারা মানুষ নয়, মানুষরূপী পশু । আপনারা আমার উপর আস্থা রাখতে পারেন, আমি এই পশুদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করতে চাই এবং জনগণের সাহায্য ছাড়া এ সম্ভবপর নয়। তাই জনগণের সাহায্য আমি কামনা করি । আমরা আজ এক মহাবিপদের মোকাবেলা করছি। যারা দেশকে ভালবাসেন, দেশের মানুষকে ভালবাসেন, তারা বিপন্ন মানুষের সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসুন, এটাই আমি অনুরোধ করব ।

আহ্বান এবং নির্দেশ তারা যেন সৎপথে থেকে নিঃস্বার্থভাবে তাদের কর্তব্য পালন করে এবং দুর্গত মানুষের সেবা করে যান। আজ বাংলাদেশের সফলতাকামী একলক্ষ্যে, এক ঘরানায়, এঁক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ- বন্যায় যারা – মারা গেছেন, তাদের আত্মার শান্তির জন্য মসজিদে, মন্দিরে, গীর্জায়, মঠে প্রার্থনা করুন। আর যে কোটি কোটি লোক আজ জেলবন্দি, তাদের নিরাপত্তা ও বিপদ মুক্তির জন্য সর্বশক্তিমানের কাছে মোনাজাত করুন। এ বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আল্লাহ যেন আমাদের সহায় হন। আসুন, আত্মমানবেতার সেবায় এবং দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাবার জন্য আমরা একযোগে কাজ করে যাই। আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন।

খোদা হাফেজ । জয় বাংলা

 

Bangabandhu Gurukul
Bangabandhu Gurukul

 

আরও পরুন :

 

“১৮ আগষ্ট ১৯৭৪ সালের দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন