১৮ জানুয়ারি ১৯৭৪ । বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর উদ্বোধনী ভাষণ

১৮ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমান একটি খুব গুরুত্বপুর্ন ভাষন দেন। সেখানে তিনি ইতিহাসের অনে গুরুত্বপুর্ন অধ্যায়ের ব্যখ্যা করেন:

সহকর্মী ভাই ও বোনেরা,

বিদেশ থেকে আগত অতিথিবৃন্দ এবং আওয়ামী লীগের কর্মী ভাইয়েরা, আপনারা আমার আন্তরিক অভিনন্দন গ্রহণ করুন । স্বাধীনতা সংরামের পর এবারই নির্বাচিত কাওন্সি সদস্য হিসেবে প্রথম আপনারা সম্মেলনে যোগদান করেছেন। কর্মী ভাইয়েরা, আওয়ামী লীগের অত্যাচারের ইতিহাস, সংগামের ইতিহাস, জয়ের ইতিহাস। আপনাদের সঙ্গে বাংলার মাঠে, প্রান্তরে, গ্রামে গ্রামে আমি কাজ করেছি।

 

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ১ম সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ
১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ১ম সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

Table of Contents

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ১ম সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম থেকে প্রথমে আমি যোগদান করি যুগ সম্পাদক হিসেবে । ৫৩ সাল থেকে  পয়ষট্টি সাল পর্যন্ত কাজ করি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে এবং ছেষট্টি সাল থেকে এ পর্যন্ত সভাপতি হিসেবে। গঠনতন্ত্রে বিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী হলে প্রতিষ্ঠানের সভাপতি, সম্পাদক কিংবা কর্মকর্তা হওয়া যায় না। তবুও গতবার আপনারা আমাকে কিছুদিনের জন্য দায়িতৃভার দিয়েছিলেন আপনাদের সভাপতি হিসেবে কাজ করার জন্য । আজ আপনাদের নতুন করে প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলতে হবে।

ফাঁকির স্বাধীনতা আপনারা জানেন কিভাবে আওয়ামীলীগের জন্ম হয়। আমরা বাংলাদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিলাম। দুই শত বছর ইংরেজ এদেশকে শাসন করে। দুই’শ বছর পরে ১৯৪৭ সালে এক ফাঁকির স্বাধীনতা আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। আমরা বাংলাদেশের জনগণ সংখ্যাগুরু ছিলাম। কিন্তু বাংলার মানুষকে শোষণের পর শোষণ করার পর সামরিক শক্তি দ্বারা পরিচালিত পাকিস্তানের সংখ্যালঘু শাসক গোষ্ঠী ১৯৪৭ সালে নতুন করে বাংলাকে পরাধীন করে।

বাংলাদেশ পাকিস্তানের কলোনীতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের মানুষকে শোষণ করে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী গড়ে তোলে তাদের দেশকে । কিন্তু বাংলার মানুষ চুপ করে থাকে না। এসব শাসন শোষণ ও সংগ্রামের অনেক ইতিহাস আপনাদের জানা আছে। কারণ অনেক আন্দোলনের মধ্যে থেকে আপনাদের জন্ম । অনেক রক্ত দিয়ে আপনাদের সংগ্রাম করতে হয়েছে । আপনাদের বার বার মোকাবেলা করতে হয়েছে শোষক শ্রেণীকে, মোকাবেলা করতে হয়েছে একদল মীরজাফরকে । বাংলাদেশের একদল শোষক যদি হাতে হাত না মিলাত_তাহলে পঁচিশ বছর পাকিস্তানীরা বাংলাকে শোষণ করতে পারত না।

যতবার আমরা সংগ্রামে এগিয়ে গিয়েছি, ততবারই এই বাংলার মাটিতে একদল লোক সেই শোষকদের হাতিয়ার হিসেবে আমাদের উপর চড়াও হয়েছে। বার বার আমরা এদের মোকাবিলা করেছি। বার বার আমরা মার খেয়েছি । অবশেষে আমরাও চরম আঘাত হেনেছি, যে আঘাতে বাংলাদেশ আজ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। সহকর্মী ভাইয়েরা ও বোনেরা, ১৯৪৭ সালের পূর্বে আমরা যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদান করেছিলাম, তখন আমাদের স্বপ্ন ছিল আমরা স্বাধীন হবো।

কিন্তু সাতচন্লিশ সালেই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমরা নতুন করে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছি। এর মধ্যে থেকেই আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। জনগণ তখন বুঝতে পারে নাই। শোষক গোষ্ঠীর নায়করা এখানে শক্তিশালী সরকার গঠন করে। তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে। এই অবশতায় আমরা কিছু শঙ্কার  দেশ প্রেমিক তাদের বিরুদ্ধে  রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করি। আমার মনে আছে ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে প্রথম আমরা ডেমোক্রেটিক ইয়ুখলীগ নামে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি।

উদ্দেশ্য শোষক গোষ্ঠির মোকাবিলা করতে হবে। কিন্তু আমরা এগুতে পারলাম না। অনেক সময় থিওরি প্রাকটিসে গণ্ডগোল হয়ে যায়। থিওরি খুব ভাল। কাগজে কলমে লেখা থিওরি অনেক মূল্যবান। পড়ে শান্তি পাওয়া যায়। কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল কাজের সঙ্গে মিল না থাকলে থিওরি কাগজে-কলমে পড়ে থাকে, কাজে পরিণত হয় না। তখনকার দিনে একদল লোক এ-ধরনের থিওরির অনুসারি ছিলো । এ সময় ভারতবর্ষে, কম্যুনিষ্ট পার্টির নেতা ছিলেন রণদিতে। তিনি পি,সি, যোশীকে তাড়িয়ে দিয়ে কম্যুনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। তিনি বললেন, এখনই অস্ত্রের সাহায্যে মোকাবিলা করা দরকার । পণ্ডিত জহরলাল

 

১০ জানুয়ারি বঙ্গ১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ১ম সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ
১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ১ম সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

নেহেরু সরকারকে উৎখাত করতে হবে। তীরা এদিক-ওদিক আঘাত হানলেন। আমাদের এখানেও কিছু সংখ্যক কর্মী বুঝতে না পেরে সেই পন্থা অবলম্বন করতে গেলেন। আমাদের সঙ্গে তাদের মতের অমিল হলো। আমরা বললাম, দেশের মানুষকে না গড়ে তুলে, দেশের মানুষকে – মোকাবিলাই না করে এবং পরিষ্কার আদর্শ না নিয়ে চলা যায় না.। তারা বুঝতে পারলেন না। ডেমোক্রেটিক ইমুখ লীগ ভেঙে গেল ।

ছাত্রলীগ ও আওয়ামীলীগের জন্মঃ

সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যখন শোষণ করতে চায়, তখন তারা আঘাত করে শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপর, ভাষার উপর তাকে ধ্বংস করতে না পারলে শোষণ করা সহজ হয়ে উঠেনা। তাই, ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানী শোষকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার উপর আঘাত হানলো। সংখ্যাগুরু লোকের ভাষার উপর আঘাত করে আমাদের উপর উর্দূ ভাষা চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করা হলো। তখন একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিলো মুসলিমলীগ | জিন্নাহ, সাহেব তখনও বেঁচে আছেন এবং তার দলের লোকেরাই বাংলাদেশে শাসন চালিয়েছিলো ।

তাদের শক্তি ছিলো, সামর্থ্য ছিলো, অর্থ ছিলো। বিদেশী শক্তিও তাদের পিছনে ছিলো । আমরা ভাষার উপর এ আঘাত সহ্য করতে পারলাম না। তারই ফলশ্রুতিতে আটচন্লিশ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ছাত্রলীগের জন্ম হয়। ১১ই মার্চ তারিখে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আমরা আন্দোলন শুরু করি। এ তারিখেই অন্যান্য কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একযোগে আমরা শোষক গোষ্ঠীর আঘাতের মোকাবিলা করি. আজ মনে পড়ে আমার বন্ধু ও সহকর্মী শামসুল হকের কথা, যার সঙ্গে অনেকদিন কাজ করেছি। তিনি আর ইহজগতে নাই ।

তিনি আওয়ামী লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তীর কথা যদি আজ আমি স্মরণ না করি, অন্যায় করা হবে। মরহুম শামসুল হক আর আমি একসঙ্গে গেফতার হই। তারপরেই আমাদের আন্দোলন শুরু হয়। আমরা বুঝতে পারলাম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন আছে। তা না হলে আন্দোলন করা যাবে না, তাই আমরা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করলাম ।

আমাদের সহকর্মীদের মোকাবিলাই করতে শুরু করলাম। আবার আমাকে গ্রেফতার করা হলো। আমার সহকর্মীদের গ্রেফতার করা হলো। আমরা সেখানে একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান করবো বলে ঠিক করলাম । ১৯৪৯ সালের জুন মাসে আমি যখন ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী তখন আওয়ামীলীগের জন্ম হয়। জেলখানায় বন্দী থাকা অবস্থায়ই তারা আমাকে যুগ্ম সম্পাদক পদে নির্বাচিত করেন ।

 

বায়ান্ন সালের আন্দলন,

অনেকে ইতিহাস ভুল করে থাকেন। ১৯৫২ সালের আন্দোলনের তথা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস আপনাদের জানা দরকার । আমি তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বন্দী অবস্থায় চিকিৎসাধীন । সেখানেই আমরা স্থির করি যে, রাষ্ট্র ভাবার উপর ও আমার দেশের উপর যে আঘাত হয়েছে ২১ শে ফেব্রুয়ারি তারিখে, তার মোকাবিলা করতে হবে। সেখানেই গোপন বৈঠকে সব স্থির হয়। এ কথা আজ বলতে পারি, কারণ আজ পুলিশ কর্মচারীর চাকরি যাবে না। সরকারি কর্মচারীর চাকরি যাবে না।

কথা হয়, ১৬ই ফেব্রুয়ারি আমি জেলের মধ্যে অনশন ধর্মঘট করব, আর ২১ শে তারিখে আন্দোলন শুরু হবে। জেলে দেখা হয় বরিশালের মহিউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে । তাকে বললাম, আমরা এই প্রোগ্রাম নিয়েছি। তিনি বলেন, আমিও অনশন ধর্মঘট করব। ১৬ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আমরা অনশন ধর্মঘট করলাম । এর দরুন আমাদের ট্রা্সফার করা হলো ফরিদপুর জেলে । সুচনা হয় ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের । তারা চরম আঘাত করলো ভাষার উপর, কৃষ্টির উপর । চরম আঘাত হানলো আমাদের উপর ।

১৯৪৯ সালের আওয়ামীলীগের জন্মের পর থেকেই গ্রেফতার অভিযান শুরু হয়। আওয়ামীলীগের কণ্ঠ রোধ করে দেওয়া হলো। আওয়ামীলীগের জীবন অতিষ্ঠ করে তোলা হলো । আওয়ামী লীগ কর্মীদের পালিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। এভাবেই আমাদের দিন কাটতে থাকে । এ অবস্থায় আমরা সং ঢালিয়ে যাই। একদিনে সংঘাম হয় না। একদিনে দেশ জয় হয় না। একদিনে আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। এজন্য চাই নীতি । ও অবস্থায় আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাই ।

সহকর্মী ভাইয়েরা, আজ এ-সব কথা কেন বলছি? এ জন্যে বলছি যে, এতকাল পর্যন্ত আপনাদের প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে সাধারণ সম্পাদক [হসেবে আমি কাজ চালিয়েছি। আজ আমার বিদায় নেওয়ার পালা । আজ আমি আপনাদের প্রেসিডেন্ট থাকতে পারি না। আজ আপনাদের নতৃন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে হবে । কারণ আমার পক্ষে আর সম্ভব নয় । এটাই আমার সভাপতির শেষ ভাষণ । এই জন্যই আপনাদের কাছে আমার কিছু বলা দরকার। এ জন্যই আজ সংক্ষেপে আওয়ামীলীগের কিছু ইতিহাস

 

বলছি। এই প্রতিষ্ঠানের কথা চিন্তা করলেই বক্তৃতা আমি দেবার পারি না। কত চেহারা ভেসে উঠে আমার সামনে । কত ত্যাগী কর্মী কারাবরণ করেছে। কত ভাই, কত সহকর্মী শহীদ হয়েছে। এদের পক্ষে দিনের পর প্রকোষ্ঠে দিন কাটিয়েছি। কত দিন আন্দোলন করতে গিয়ে বিপদের সম্মুখীন হয়েছি। তাদের কথা আমি স্মরণ না করলে অন্যায় করা হবে। কারণ, আজ দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু তারা আমাদের মধ্যে নাই । ১৯৪৯ সালে আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর চরম আঘাত আসে আওয়ামীলীগের উপর ।

শোষকগোষ্ঠীর আমাদের ভাষা ও কৃষি উপর হামলা চালায়। অত্যাচার চালায় বাংলার মানুষের উপর । কিন্ত আমরাও বসে, থাকি নাই। বাংলার জনগণ, বাংলার ছাত্র সমাজ, বাংলার যুব সমাজ, বাংলার প্রগতিশীল কর্মীরা এই হামলার মোকাবিলা করতে থাকে বার বার। কিন্তু অপরপক্ষ ছিল বড় শক্তিশালী । তাদের হাতে ছিল অস্ত্র, মেশিনগান । তাদের কাছে ছিল অর্থ, ছিল ধোকাবাজি। তারা বিশেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতো ধর্মের নাম । আমার বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু ৷ তাই ধর্মের নামে ধোকা দেয়া যত সহজ, অন্য কিছুতে ততটা সহজ নয়। তাই ধর্মকে তারা ব্যবহার করলো বাংলার মানুষকে শোষণ করার বস্ত্র হিসেবে ।

 

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ১ম সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ
১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ১ম সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

শোষকের নয়া ষড়যন্ত্র

১৯৫২ সালের আন্দোলনের পরে শোষকগোষ্ঠী দেখলো যে বাংলা ভাষাকে ওভাবে দাবানো যাবে না। তাই তারা ছলে বলে কৌশলে আমাদের ভাষা কৃষ্টি ও সভ্যতাকে এবং আমাদের আন্দোলনকে বানচালের চেষ্টা করতে আরম করে। ভাই ও বোনেরা, ১৯৫৪ সালের ইতিহাস আপনারা জানেন। আমরা বায়ান্ন সালে জেল থেকে বের হয়ে আসি । তিক্লান্ন সালেও আমাদের অনেক কর্মী গ্রেফতার হয়। ১৯৫৪ সালে একটা নির্বাচন দেওয়া হল। আওয়ামী লীগের নেতৃতে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। বাংলাদেশে

নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সেই যুক্তফ্লন্ট। বাংলার মানুষ একতাবদ্ধ হয়। শেরে বাংলা ফজলুল হক তখন চীফ মিনিষ্টার হন। কিন্তু পাকিস্তানের শোষকগোষ্ঠী আতকে উঠে। তারা বাংলার মানুষকে একতাবদ্ধ হতে দেবে না। তাই আবার তারা আঘাত হানার চেষ্টা করে। যেদিন আমি মন্ত্রী হিসেবে শেরে বাংলার কেবিনেটে শপথ নিয়েছি, সেদিনের কথা আমার মনে আছে। ঠিক সেই সময় এক ঘন্টার মধ্যেআদমজীতে এক সাম্প্রদায়িক বাজার সৃষ্টি করা হলো ।

তারা ষড়যন্ত্র করলো এই সরকারকে উৎখাত করতে হবে। তাই সৃষ্টি করলো তাদের দালালদের দিয়ে এই দাঙ্গা। মানুষের জন্য তাদের কোন দরদ ছিল না। মানুষকে তারা ভালোবাসত না। ক্ষমতাকেই তারা বড় করে দেখতো । তাই চুয়ান্ন সালে তারা দাঙ্গা বাধালো আদমজীর পাট কলে । আমার মনে আছে পাঁচশ’রও বেশি লোক সেখানে মারা যায়। শপথ নিয়েই সেখানে আমরা দৌড়ে যাই। উপস্থিত হই। মোকাবিলা করি । মানুষকে বুঝাবার চেষ্টা করি। ১৯৫১ সালেও তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে বাংলার মাটিতে ।

এতে এদেশের অনেক নিরীহি লোক জীবন দেয়। এই দাঙ্গা তারা সৃষ্টি করে বাঙ্গালী জাতিকে বিভক্ত করার জন্য । কারণ, বাংলাদেশে যদি বিভেদ সৃষ্টি করা না যায়_ তাহলে তারা শাসন-শোষণ চালাতে পারবে না। এমনি করে তারা চালায় তাদের ষড়যন্ত্র! আমার মনে আছে তদানীত্তন প্রাদেশিক পরিষদের ৫০ জনের মত  সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। আমাদের কয়েক হাজার কর্মী গ্রেফতার হয়। বাংলার মানুষের উপরে অত্যাচারের স্টিম রোলার চলে। কিন্তু আমরা নিরুৎসাহ হই নাই। আমরা আরও সংঘবদ্ধভাবে সংগ্ৰাম আরম্ভ করার চেষ্টা করি। আমরা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। আওয়ামীলীগের পরিষ্কার আদর্শ আমাদের সামনে ছিল। আওয়ামী লীগের ম্যানিফেষ্টো ছিল। তাদের কর্মী ছিল, তাদের প্রতিষ্ঠান ছিল।

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চারটি স্তত্ত,

সহকর্মী  ভাইয়েরা , আমাদের রাষ্ট্রের চারটি আদর্শ আছে । রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তেমনি চারটি স্তত্ত থাকা প্রয়োজন। এই চারটি স্তস্ত ছাড়া কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। আমি গর্বিত যে পচিশ বছরে আওয়ামীলীগ সেই স্তস্তগুলি প্রতিষ্ঠিত করেছে। পঁচিশ বছরের আওয়ামী লীগ কর্মীদের জন্য আমি গর্বিত। বার বার জনগণের সাহায্য ও সমর্থনের জন্য আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রথম আয়োজন সঠিক নেতৃত্বের।

সঠিক নেতৃত্‌ ছাড়া রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। আওয়ামীলীগ নেতৃত্‌ দিয়েছে। নেতারা চেষ্টা করেছেন সঠিক নেতৃত্‌ দেওয়ার জন্য। নেতৃত্বের সঙ্গে প্রয়োজন আদর্শের । যাকে অপর কথায় বলা যায় ম্যানিফেন্ট্রো। প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য কি আদর্শ কি এটা থাকতেই হবে। নেতৃত্ব ও আদর্শের পরে প্রয়োজন নিঃস্বার্থ কর্মীর । নিঃস্বার্থ কর্মী ছাড়া কোন প্রতিষ্ঠান বড় হতে পারে না, কোন সংগ্রাম সাফল্যমভিত হতে পারে না।

 

এরপরে প্রয়োজন সংগঠনের । সংগঠন ছাড়াও কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কাজ সফল হতে পারে না। সেজন্যই বলছিলাম রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের চারটি জিনিষের প্রয়োজন এবং তা হচ্ছে নেতৃতু, ম্যানিফেষ্টো বা আদর্শ নিঃস্বার্থ কর্মী এবং সংগঠন । আমি আনন্দের সাথে বলতে পারি যে, আওয়ামীলীগের ১৯৪৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত নেতৃত্ব ছিল, আদর্শ ছিল, নিঃস্বার্থ কর্মী ছিল এবং সংগঠন ছিল । এই ভিত্তির উপরই অংগ্রামে এগিয়ে গিয়ে আওয়ামীলীগ ইতিহাস সৃষ্ট করতে পেরেছে।

আইয়ুবের সামরিক শাসন,

১৯৫৪ সালের পর অনেক ইতিহাস। আমরা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাই। ১৯৫৫ সালে আওয়ামীলীগ অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় । তারপর পূর্ণ স্বায়ত্শাসনের আন্দোলন শুরু হয়। বাংলাদেশের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চলে। কিন্তু শোষক গোষ্ঠী দেখলো যে, এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। তাই ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারী করে আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। বাংলাদেশ আরও বিপদের মধ্যে গিয়ে পড়ে, কারণ সামরিক বাহিনীর শতকরা ৯৫ জন ছিল তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের । তারা বাংলাদেশেরও সরকার দখল করল ।

মার্শাল “ল জারি করার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে শোষণ করা । আমরা গ্রেপ্তার হলাম । সহকর্মীরা গ্রেপ্তার হলো। আওয়ামীলীগ পার্টি ব্যন্ড হলো, আওয়ামীলীগ কর্মীরা গ্রেপ্তার হলো। তাদের বিরুদ্ধে বহু মিথ্যা মামলা জারী করা হলো। কিন্তু তারা চুপ করে বসে রা সংখ্যাপ্তরু । তারা সংখ্যালঘু হওয়া সর্তেও বন্দুকের জোরে  বাংলার মানুষের উপর  মিলিটারি শাষন আরম্ভ করল ।। সেখান   সামরিক বাহিনী হেটকোয়াটার,আসেম্বলি সব কিছু প্রতিষ্ঠিত হলো । পনের’শ মাইল দূরের দুটি অংশ নিয়ে কোন সময় কোন একটি রাষ্ট্র হয়েছে বলে আমার জানা নাই। কিন্তু আমরা ধর্মভীরু মানুষ_ তাই পাকিস্ত নীরা ধর্মের নামে এক রাষ্ট্রের দোহাই দিতে আরম্ভ করলো ।

Bangabandhu Gurukul
১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ১ম সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

আমরা যারা ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম_ তারা সংগ্রাম করেছি। যারা বুঝতে চেষ্টা করে নাই_ তারা তাদের দালালী করেছে।

বাষট্টি সালের আন্দোলন,

১৯৬২ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেব গ্রেপ্তার হন। ছাত্ররা আন্দোলন শুরু . করে। আওয়ামীলীগ পার্টি তখন ব্যান্ড। অন্যান্য পার্টিও ব্যান্ড ছিল। আমরা জেল থেকে চেষ্টা করলাম, কি করে প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখা যায় এবং সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া যায়। আমরা আওয়ামীলীগকে বাচিয়ে রাখলাম। আওয়ামীলীগ কর্মীরা যে যেখানে ছিল বিপদের সম্মুখীন হয়েও নীতি পরিবর্তন না করে, আদর্শ পরিবর্তন না করে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। আমরা চিন্তা করে দেখলাম এদের সংগে আর আমাদের চলবে না।

যেখানে আদর্শের মিল নাই-_ যেখানে মতের মিল নাই, যেখানে ভাবার মিল নাই, যেখানে চিন্তার মিল নাই সেখানে এক রাষ্ট্র চলতে পারে না। আজ কোথায় পাকিস্তান, কোথায় বাংলাদেশ। পনের’শ মাইলের ব্যবধানে তার সংগে আমাদের কোন প্রত্যক্ষ যোগাযোগ নাই । এক রাষ্ট্র করা হয়েছিলো বাংলাদেশকে শোষণ করার জন্য, কলোনী করার জন্য । তারা সাড়ে সাত কোটি লোকের বাংলাদেশকে তাদের শিল্প পণ্যের বাজারে পরিণত করে। তাদের কল-কারখানার শিল্প দ্রব্য বাংলাদেশে বিক্রয় করে এখানকার অর্থ সম্পদ লুটে নেয়।

আমাদের কিছু কিছু হতেন, সামান্য ব্যবসায়ী হলেও খুশি হতেন। কিন্তু সাড়ে সাত কোটি মানুষের কথা তারা চিন্তা করতেন না। ১৯৬৪ সালে সোহরাওয়ার্দী সাহেব এন্তেকাল করলেন। আওয়ামীলীগকে আমরা রিভাইব করলাম । আবার আমরা আওয়ামীলীগকে অর্গানাইজ করার উদ্যোগী হলাম । এই সময় কিছু কিছু লোক আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে চলে গেল। ভালই হলো । আবর্জনা যতই যায় ততই মজল। কয়েকবারই এরকম হয়েছে। কিন্তু তাতে প্রতিষ্ঠানের কোন ক্ষতি হয় না। যাদের আদর্শ নাই, প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে যায়। তাতে প্রতিষ্ঠান দূর্বল হয় না, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়। তাই ভবিষ্যতেও এ ধরণের লোকদের প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দিয়ে আওয়ামীলীগকে আপনাদের আরো শক্তিশালী করতে হতে পারে।

পরিষ্কার রাস্তাঃ৬ দফা

ভাইয়েরা ও বোনেরা, আমরা আমাদের সহকর্মীদের নিয়ে সুনির্দিষ্ট পথে যাওয়ার স্থির সিদ্ধান্ত নিলাম । তারপর অনেক ভাঙ্গা গড়া হলো। ১৯৬৯ সালে আমার দেশবাসী জানতে চায় পাকিস্তান রাস্তা কোথায়? বাঙ্গালী চায় কি? তাদের সামনে কি আছে? তখন ডিফেস অব পাকিস্তান রুল নামে একটা পদার্থ ছিল। ফাল্ডামেন্টাল রাইটস ছিল না, আইয়ুবী শাসন চলছিল তখন বাংলার মাটিতে । অত্যাচারের স্টিম রোলার চলছিল বাংলার মাটিতে আমাদের চোখের সামনে । আমি আমার সহকরমীদের নিয়ে বসলাম- পরিষ্কার পন্থা দিতে হবে।

বাংলার মানুষকে আর আমরা এভাবে শোষিত হতে দিতে পারি না। মানুষের একদিন মরতে হয়। করবো । কিন্তু পরিষ্কার রাস্তা দেখাতে হবে । ওদের সঙ্গে আমরা থাকতে পারি না। আমার বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে । বাংলার মানুষকে রক্ষা করতে হবে। বাংলার অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে । শোষণহীন সমাজ গড়ে তুলতে হবে। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তন করতে হবে। কিন্তু পাকিস্ত বনের সঙ্গে থেকে বাংলার মানুষ তা কোনদিন করতে পারবে না।

এর উপায় কি? এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলতে চাই, ধারা মনে করেন রাতের অন্ধকারে গুলি করে কিংবা রেল লাইন তুলে দিয়ে টেরোরিজম করে বিপ্লব হয়, তারা কোথায় আছেন তারা জানেন না। এই পন্থা বহু পুরানো পন্থা । এই পন্থা দুনিয়ায় কোন দিন কোন কাজে লাগে নাই। এ পন্থা দিয়ে দেশের মানুষের কোন মঙ্গল করা যায় না। একটা রাস্তা ভেঙ্গে দিয়ে ও একজন লোককে অন্ধকারে হত্যা করে শুধু শুধু মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয়।

এই টেরোরিজম দিয়ে দেশের বিপ্ব হয় না, হয় নাই, হতে পারে না। জনগণকে ছাড়া, জনগণকে সংঘবদ্ধ না করে, জনগণকে আন্দোলনযুখী না করে এবং পরিষ্কার আদর্শ সামনে না রেখে কোন রকম গণ-আন্দোলন হতে পারে না এবং সেখানে কোন বিপ্লব হতে পারে না। দুঃখের বিষয়, অনেকে এখনও টেরোরিজম-এ বিশ্বাস করেন। যাই হোক, ভবিষ্যতে তাদের ভুল ভাঙ্গবে । সময় থাকতে না ভাঙ্গলে তাদের ক্ষতি বেশি হবে। জনগণের ক্ষতিতো হবেই, কিন্তু তাদের ক্ষতি হবে।

পরিষ্কার রাস্তা হিসেবে ১৯৬৬ সালে ৬-দফা দেয়া হলো আইয়ুব খান অস্ত্রের ভাষা ব্যবহার করবেন বলে হুমকী দিলেন। আইয়ুব খান বোকা ছিলেন না। আইয়ুব খান বুঝতে পারলেন, ৬-দফা আওয়ামী লীগ কেন দিয়েছে? এর পিছনে উদ্দেশ্য কি? পাকিস্তানীরা বুঝতে পেরেছে, এর উদ্দেশ্য কি এবং আমরা জানতাম আমাদের উদ্দেশ্য কি ও কোথায় আমরা যাবার চাই । কি আমরা বোঝাতে চাই ।

আগরতলা বড়যন্ত্র মামলা

৬-দফা বাংলার মানুষের মুক্তি সনদ। আমরা মুক্তি সনদ কেন দিলাম, আইয়ুব খান বুজতে পারলেন। তাই তিনি আগরতলা বড়যন্ত্র মামলা করলেন আমাদের বিরুদ্ধে-সামরিক বাহিনীর কিছু বাঙ্গালী ছেলে, বাঙালী সরকারী কর্মচারী ও আওয়ামীলীগের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে । তারা আমাদের কারাগারে বন্দী করবেন। আওয়ামীলীগ ভাঙ্গার জন্য পাকিস্তান থেকে কিছু নেতা এসে তখন চেষ্টা করলেন । ভাঙ্গনের কিছুটা । কিছু কিছু আওয়ামীলীগ নেতা বুঝতে না পেরে যোগদান করলেন তাদের সাথে। আমি তখন কারাগারে বন্দী ।

আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দিন, মনসুর আলী, শামসুল হক, জালাল, জহুর ও চিটাগাং এর আজিজ সহ আমার বহু সহকর্মীও বন্দী হয় । যারা বাইরে রইলো, তারা ৬-দফাকে আঁকড়ে ধরলো । তারা মোকাবেলা করলো, নেতৃত্ব দিলো। নজরুল ছিলেন এ্যাকটিং প্রেসিডেন্ট, এই অবস্থায়ই তারা শুরু করলো। শাসকরা পারলো না আওয়ামী লীগকে দাবাতে।

গণ-অভ্যুত্থান

বাংলার ছাত্র জনতা রুখে দীড়ালো এর বিরুদ্ধে । গণ-আন্দৌলন শুরু হলো। ছাত্র  সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো । ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও অন্যান্য সব প্রগতিশীল ছাত্র প্রতিষ্ঠান এঁক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করলো । তারা আওয়ামীলীগকে সক্রিয় সমর্থন দিলো এবং তাদের সঙ্গে যোগদান করলো । আইয়ুব খানের আসন নড়ে উঠলো । আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা উইথড্র হয়ে গেলো । আমরা খালাস পেলাম । আবার একটা ফন্দি করা হলো ।

রাউণ্ড টেবিল কনফারেন্স। রাউ্ টেবিল কনফারেন্সের উদ্দেশ্য ছিল একটা কনষ্টিটিউশন প্রবলেম সলভ করা। আমি আমার সহকর্মী ছাড়াও কয়েকজন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গেলাম আমার সংগে । কারণ আমাদের বুঝতে হবে, এটা রাউ্ড টেবিল কনফারেন্স না ধোকা । আসলে এটা ছিলো বাংলাকে শোষণ করার আরেকটা ষড়যন্ত্র। তাই আপনাদের পক্ষ থেকে আমি তা রিজেন্ট করলাম। বলে দিলাম, সংশ্বাম করে বাংলার মানুষ তাদের দাবী আদায় করবে, রাউণ্ড টেবিলে বসে নয়।

ইয়াহিয়ার আবির্ভাব

আইয়ুব খান বিদায় নিলেন। ইয়াহিয়া খানকে বসিয়ে দেওয়া হলো। প্রেসিডেন্ট হয়ে বসে পড়লেন আর এক জেনারেল সাহেব! তিনি বললেন, নির্বাচন দিবেন। নির্বাচন দেওয়া হলো। আমাদের অনেকে বুঝতে পারলেন না। তারা বড় বড় ব্তৃতা করলেন, প্রশ্ন করলেন_ কেন আমরা নির্বাচনে যাচ্ছি? বাংলার মানুষ যে একতাবদ্ধ, এক; বাংলার মানুষ যে বাচতে চায়,বাংলার মানুষ যে মুক্তি চায়, তার জন্য আমাদের নির্বাচনে যাওয়া প্রয়োজন।

 

তারা একথা বুঝতে পারেন নাই। বুঝতে পারেন নাই, শেখ মুজিব আর আওয়ামীলীগের উদ্দেশ্য কি? আমরা নির্বাচনে গেলাম । আমরা ১৬৯ টি সিটের মধ্যে ১৬৭টি সিট ক্যাপচার করলাম । দুনিয়া দেখলো, বাংলার মানুষ একতাবদ্ধ। এই প্রথম একতাবদ্ধ। বাংলার মানুষের মধ্যে কনফিডেস ফিরে আসলো। ইয়াহিয়া খান আতকে উঠলেন। শোষকগোর্ঠী আঁতকে উঠলো । তারা আঘাত করার জন্য প্রস্তুত হলো। আমরা জনগণকে আন্দোলনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেলাম।

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ২য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ
১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ২য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ২য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

আমরা শপথ গ্রহণ করলাম যে, নীতির সঙ্গে কোন আপোষ নাই। জনগণ যে ম্যাণ্ডেট দিয়েছে, তা থেকে আমরা সরতে পারি না। তারপরের ইতিহাস চরম ইতিহাস। ধাপে ধাপে বাংলার মানুষকে এগিয়ে নিতে হয়েছে। ধাপে ধাপে বাংলার মানুষকে আন্দোলন করতে হয়েছে। অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। অনেক ব্তৃতা করে, বড় বড় তেজি বক্তৃতা ৪ কিন্তু তারা জানে না ১৯৪৭-৪৮ সাল কি ছিলো। ১৯৫০, ৫২, ৫৪ সাল কি ছিল। ওরা জানে না ১৯৫৭-৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৫-৬৬, ১০৬৮-৬৯ ও ৭০ সাল কি ছিলো।

ওদের কারো কারো সে দিন জন্ম হয় নাই। অনেকে আন্দোলন দেখে নাই। আন্দোলন কাকে বলে জানে না। কোন দিন জীবনে জেলের দরজা দেখে নাই। অবিচারের সামনে পড়ে নাই। আন্দোলন গাছের ফল নয়। আন্দোলন মুখ দিয়ে বললেই করা যায় না। আন্দোলনের জন্য জনমত সৃষ্টি করতে হয়। আন্দোলনের জন্য আদর্শ থাকতে হয়। আন্দোলনের জন্য নিঃস্বার্থ কর্মী থাকতে হয়। ত্যাগী মানুষ থাকা দরকার । আর সর্বোপরি জনগণের সংঘবদ্ধ ও এঁক্যবদ্ধ সমর্থন থাকা দরকার ।

 

অসহযোগ আন্দোলন

তারা ভুলে যায়, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পরে আওয়ামীলীগের ইতিহাস ভুলে যায়, কিভাবে ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ থেকে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ এককভাবে এদেশে নন-কোঅপারেশন মুভমেন্ট করে। ছাত্র জনতা, ধর্ম, শ্রেণী ও পেশা নির্বিশেষে তাতে যোগদান করেছিলো । দেশের মানুষ সংঘবদ্ধ ছিলো, শোষকগোষ্ঠি আতকে উঠেছিলো । শোষকরা জানতো এবং আমরাও জানতাম যে, আওয়ামীলীগ তাদের দাবী থেকে এক চুলও নড়বে না। কারণ আওয়ামীলীগ কোনদিন ওয়াদা ভঙ্গ করে নাই ।

তারা ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারে না। বাংলার মানুষ যা বলেছে_ তাই হবে। এর পিছনে সবার ক্ষমতা আমাদের নাই। তাই আমি সেদিন বলেছিলাম ৬-দফা জনগণের সম্পদ, আওয়ামীলীগের আর শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পদ নয়। ওটার সঙ্গে আপোষ হয় না । অনেকে গোপনে আপোষের প্রপাগাণ্ডা করতেন। কিন্তু আমরা জানতাম যে ইয়াহিয়া খান সৈন্য সমাবেশ করছেন। আজ সকলের জানা দরকার আমরাও বসে ছিলাম না। আমরা যদি বসে থাকতাম একই সময় একই মুহূর্তে বাংলাদেশের ৫৮টা মহকুমায় সশস্ত্র বিপ্লব শুরু হতো না।

রেসিসট্যান্ট মুভমেন্ট শুরু হতো না। শুরু হয়েছিলো এজন্য যে, তখন আওয়ামীলীগ নেতৃত্‌ দিচ্ছিলো । ২৫খে মার্চ তারিখে আমি বখন স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম, আমি যখন বাংলার মানুষকে ডাক দিলাম_তখন আমি গ্রেফতার হয়ে গেলাম । কিন্ত আমার সহকর্মীরা আমার অনুপস্থিতিতেও সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সংগ্রাম উপরের থেকে পড়ে নাই। নজরুল তখন আ্যাকটিং প্রেসিডেন্ট হয়েছিলো । প্রেসিডেন্ট আমাকে করে তাজউদ্দিন প্রাইম মিনিষ্টার হয়েছিলো । তারা দেশের এই সংগ্রাম চালায়।

অবশ্য আমাদের সহযোগী দু-একটা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান আমাদের সমর্থন দিয়েছিলো । কমুনিষ্ঠ পার্টি দিয়েছিলো । আমাদের মোজাফ্ফর ন্যাপও দিয়েছিল । কিন্তু সেদিন প্রতিষ্ঠান ছিলো কার? নেতৃত্ব ছিলো কার? আজ যারা বড় বড় কথা বলে, কোথায় ছিলো তারাঃ কোথা থেকে তারা এসেছে? কে তাদের কথা শুনতো?

প্রতিরোধ সংগ্রাম

আজকে তারা সশ্রাম করে গভর্ণমেন্ট গঠন করতে চায়। ২৫শে মার্চ তারিখে কার উপরে আক্রমণ শুরু হয়? আক্রমণ শুরু হয় আওয়ামীলীগের উপরে, আওয়ামীলীগের কমীর্দের উপরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের উপরে, রাজারবাগে আমার পুলিশের উপরে, আমার সামরিক বাহিনীর বাঙালী ছেলেদের উপরে, আর আমার বি ডি আর-এর উপরে । এরপর রেসিসট্যাস মুভমেন্ট আরম্ত হয়। এরোপ্নেন, জাহাজ না থাকলে তারা কিছুই করতে পারতো না। আমাদের অস্ত্র ছিলো না।

সামান্য যা জোগাড় করতে পেরেছিলাম সেগুলি সমস্ত জায়গায় বাংলাদেশের মহকুমায় মহকুমায় পাঠানো হয়েছিল । প্রত্যেক মহকুমায় মহকুমায় আমাদের কমাগ্ডার ঠিক করা ছিলো। প্রত্যেক জিলায় জিলায় আমাদের কমাণ্ডার ঠিক করা ছিলো। স্বাধীনতা আন্দোলন একদিনে হয় নাই। স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়েছে ২৫ বছর আগে থেকে । আওয়ামীলীগের জন্ম, সংগ্রামের জন্ম, আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।

আওয়ামীলীগ প্রতিষ্ঠানের আজ যদি মৃত্যু হয_ তবে আমি দেখতে চাই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই যেনো মৃত্যু হয়। কর্মী ভাইয়েরা, আজ তোমাদের সামনে আমার অনেক কথা বলার আছে। কত হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোক শহীদ হয়েছে বাংলার স্বাধীনতার জন্য । আজও তাদের চোখের পানি যায় নাই। সেই সং আওয়ামীলীগের এমন কোন কর্মী নাই, যার বাড়ী-ঘর জ্বালাইয়া দেওয়া হয় নাই। গ্রামে গ্রামে আওয়ামী লীডারদের বাড়ী কোনটা, আওয়ামী লীগের কর্মীর বাড়ী কোনটা, আওয়ামীলীগের বাপ-মা কে_সেইগুলি বেছে বেছে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামীলীগ কর্মীকে ধরতে পারলে এক মুহূর্তও দেরী করে নাই, গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

স্বাধীনতার ঘোষণা,

বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ যুবক, লক্ষ লক্ষ কৃষক, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক রক্ত দিয়েছে আর কারো কথায় নয়_শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকেই তারা জীবন : দিয়েছে। স্বাধীনতার ইতিহাস কোনদিন মিথ্যা করতে নাই। আমার সহকর্মীরা, যারা এখানে ছিলো তারা সকলে জানতো যে ২৫ তারিখে রাত্রে কি ঘটবে । তাদের বলেছিলাম, আমি মরি আর বাঁচি সংগ্রাম চালিয়ে যেয়ো । বাংলার মানুষকে মুক্ত করতে হবে। ৭ই মার্চ কি স্বাধীনতা সংঘামের কথা  বলা বাকী ছিলোঃ প্রকৃতপক্ষে ৭ই মার্চই স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা বলা বাকী ছিলো।

প্রকৃতপক্ষে ৭ই মার্চেই স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল। সেদিন পরিষ্কার বলা হয়েছিলো_“এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম-এবারের সংঘাম মুক্তির সংগ্রাম ।” সহকর্মী ভাইয়েরা, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস আপনারা জানেন, আমি আর বলতে চাই না। ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তানের শোষকগোষ্ঠী কি করেছে আপনারা জানেন । দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা, রাস্ত-ঘাটের অবস্থা, পোর্টের অবস্থা সবই আপনারা জানেন । ১০ই জানুয়ারী তারিখে আমি হাসতে হাসতে বলেছিলাম, আজ আমি বেঁচে আছি, অথচ আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছিলো ।

এ দু’বছর আমার লাইফের এক্সটেনশন হলো । ৫৭ বছর চাকুরী হয়ে গেলে সরকারী চাকরী যেমন এক্সটেনশন হয় তেমনি আমার লাইফেরও এক্সটেনশন হয়েছে। কিন্তু কয় বছর এক্সটেন হয়েছে তা আমার জানা নাই। কারণ, ওটা খোদার হাতে । তবে দুই বছর পার হয়েছে বলতে পারি । আমার সহকর্মীদের দশা হয়েছিল তাই। ধরা পড়লে আর এক্সটেনশন হতো না, সঙ্গে সঙ্গে শেষ ।

অর্থনৈতিক মুক্তি

তাই আজকে ভেবে দেখুন, যে আদর্শের জন্য স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছেন, সে আদর্শ কি? কেন স্বাধীনতা সংগ্রাম করলাম? কেন লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন দিল? আজ সত্যই আমরা স্বাধীন। আজ আমার পতাকা ওড়ে । আজ আমার জাতীয় সঙ্গীত বাজে। দুনিয়ার ১১৬টি দেশ আমাদের রিকগনিশন দিয়েছে। আজ আমার কণ্ঠ ও ভাষার উপর কেউ আঘাত করতে পারবে না। আজ বাংলার মাটি আমার, আমি বাংলার মাটির । আজ বিদেশী শোষকরা আমার দেশকে শোষণ করতে পারবে না। আজ সাম্রাজ্যবাদের দালাল, বাংলার মাটিতে স্থান পাবে না।

আজ আমরা বাংলার মানুষকে শোষণ করতে দিব না। আজ বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। এটা একদিক । আর একদিক রয়েছে। সহকর্মী ভাইরা মনে রেখ, কোনদিন আমি আমার কথা না বুঝে বলি না। আমি জেনে শুনেই বলেছিলাম, স্বাধীনতার সংঘ্বাম, মুক্তির সংগ্রাম । কিন্তু মানুষ মুক্তি পাবে সেই দিন, যেইদিন অর্থনৈতিক মুক্তি দেবা ধলার মানুষকে । তোমরা এক যুদ্ধে জয়লাভ করছো, দ্বিতীয় যুদ্ধ শুরু করেছো । আওয়ামীলীগের সহকর্মীরা, এই খানেই তোমাদের পরীক্ষা, অগ্নি পরীক্ষা।

ভারতের বন্ধুত্ব

আজ আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে ভারতবর্ষের কথা স্মরণ করি। পাকিস্তানী বর্বর বাহিনী পাঁচ ডিভিশন সৈন্য নিয়ে বাংলার মাটিতে থাকতে পারে নাই । এক কোটি লোক ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলো। আমার সহকর্মীরা আশ্রয় নিয়েছিলো । ভারতের জনগণ এবং শ্রীমতি গান্ধী ও তার সরকার বাংলার মানুষকে যদি সেইদিন আশ্রয় না দিত, যদি সান্তনা না দিত-বাংলার ।

 

আমার দেশের মানুষকে শেষ করে দিত। তাই আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে তাদের স্মরণ করি। চাই- এ বন্ধু এমনি আসে নাই। দুর্দিনে যে লোক আমার পাশে দীড়ায়_ স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ, ভারত স্বাধীন সার্বভৌম দেশ । তার ব্যাপারে আমি হস্তক্ষেপ করবো না। আমার ব্যাপারে তারা হস্তক্ষেপ করবে না। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের ভিত্তিতে আমি বাস করতে চাই । আজ আমি স্মরণ করি আমার সহকর্মী ভাইদের কথা, আমার বাংলার জনগণের কথা-যে জনগণ রক্ত দিয়ে গেছে।

স্মরণ করি আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের কথা-যারা রক্ত দিয়েছে, যারা মরে শহীদ হয়েছে, যারা আজ পঙ্গু হয়ে আছে । আমি স্মরণ করি সেই মা-বোনদের কথা, যাদের উপর অত্যাচার হয়েছে, সেই সঙ্গে আমি নিশ্চয়ই স্মরণ করি ভারতের সেই সমস্ত সেনাবাহিনীর জোয়ানদের কথা, ১৪ হাজার জোয়ান, যারা বাংলার মাটিতে রক্ত দিয়ে বাংলার মানুষকে বাঁচিয়েছিলো ।

স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে

ছেলে খেলা নয়। রাষ্ট্র চালানো এতো সোজা নয়। আওয়ামীলীগ কর্মী ভাইয়েরা, আমি আগেই বলেছি- আজ স্বাধীনতা সংগ্রাম করে আমরা স্বাধীন হয়েছি, এখন আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জণ করতে হবে। যে জনগণ সংঘবদ্ধভাবে আপনাদের পাশে দীড়িছিলো, সেই জনগণ কিন্তু আজও আছে। যদি আজ জনগণ আপনাদের অশ্রদ্ধা করে, যদি আজ জনগণ আপনাদের ভাল না বাসে, জনগণ যদি আপনাদের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে, জনগণ যদি আপনাদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে_ সেই জন্য বাংলার জনগণ দায়ী হবে না।

দায়ী হবেন আপনারা, দায়ী হব আমরা । আপনারা জানতেন না কোনদিন আপনারা ক্ষমতায় আসবেন। আওয়ামলীলীগ সহকর্মীরা, আপনারা জানতেন না এত সহজে কোনদিন আপনারা যুদ্ধে জয়লাভ করবেন। এত তাড়াতাড়ি স্বাধীনতা পাবেন । আপনারা আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিলেন । রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা এনেছি । এ স্বাধীনতাকে আমাদের রক্ষা করতে হবে । কিন্ত স্বাধীনতা পেলেও বিদেশী দালালরা আজ চুপ করে বসে নাই। এ স্বাধীনতাকে তারা আজ সহজে গ্রহণ করতে পারে নাই।

সেই জন্যই তারা ছলে বলে কৌশলে কাজ করছে। সম্মুখ সমরে না যেয়ে পিছনের রাস্তা অবলম্বন করেছে। পিছনের পথ দিয়ে ছলে বলে কৌশলে দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছে। মাত্র দু’বছর আগে আমরা যে স্বাধীনতা পেয়েছি, তাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে।

চারটি রাস্ত্রীয় সতত

আমি বিশ্বাস রাখি, আওয়ামীলীগ কর্মীদের জীবন থাকতে এ স্বাধীনতা কেউ নস্যাৎ করতে পারবে না। সহকর্মী ভাইয়েরা, আজ আপনাদের সামনে যথেষ্ট কাজ রয়েছে। স্বাধীনতা পাওয়া যেমন কষ্টকর, স্বাধীনতা রক্ষা করাও তেমনি কষ্টকর। আজ আমাদের নীতি পরিষ্কার। আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে চারটা স্তম্ভ রয়েছে। এটার মধ্যে কোন কিন্তু টিন্ত নাই। এটা পরিষ্কারভাবে শাসনতন্ত্র দেওয়া হয়েছে । আমরা জাতীয়তাবাদ বিশ্বাস ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি। আওয়ামীলীগ পার্টি বিশ্বাস করি। আমরা ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করি ।

আওয়ামীলীগ পার্টি বিশ্বাস করে_ আওয়ামী লীগ সংগ্রাম করেছে, তাই আওয়ামীলীগের ম্যানিফোষ্টোতে যে নীতি ছিল_ তা আজ রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। এটা রক্ষা করার দায়িত আওয়ামী লীগ করমীদের সবচেয়ে বেশী । যে বিশ্বাস করবে না, তার জন্য রাস্তা খালি আছে। আমাদের নীতি যদি পছন্দ না হয়-চলে যেতে পারেন। থাকলে নীতি বিশ্বাস করে থাকতে হবে। মানুষ মরতে পারে, নীতি আদর্শ মরে না কৌনদিন। স্বাধীনতা সংঘামে জয়লাভের পরে আপনারা শাসনতন্ত্র দিয়েছেন।আপনারা নির্বাচন দিয়েছেন। বাংলার মানুষ শতকরা ৯৭টি সিট আপনাদের দিয়েছে । এদেশ শাসন করার অধিকার আপনাদের আছে।

আত্মসমালোচনা আত্মসত্যম আত্মশুদ্ধি

কিন্ত দেশ শাসন করতে হলে নিরশারত কর্মীর প্রয়োজন । হাওয়া-কথায় চলে না। সেদিন ছাত্ররা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলো। তাদের বলেছিলাম, আত্রসমালোচনা কর । মনে রেখো আত্মসমালোচনা করতে না পারলে নিজকে চিনতে পারবা না। তারপর  আত্মসংযম কর, আর আত্মাশুদ্ধি কর। তাহলেই দেশের মঙ্গল করতে পারবা । আওয়ামী লীগ কর্মী ভাইয়েরা, কোনদিন তোমরা আমার কথা ফেলো নাই জীবনে।

আমি কোনদিন কণ্টেষ্ট করে আওয়ামীলীগের সাধারণ  সম্পাদক বা প্রেসিডেন্ট হই নাই। জীবনভরই তোমরা আমাকে সর্বসম্মতিক্রমে নেতৃতৃ দিয়েছো । তোমরা আমার কথায় রক্ত দিয়েছো, আজ শেষ দিন-কেন না আমি সভাপতি পদ ছেড়ে দিয়ে যাচ্ছি-তোমরা আমার কথা মনে রেখ। আমার কথা ভুলো না। কোনদিন স্বার্থে অন্ধ হয়ে তোমাদের ডাক দেই নাই। কোনদিন কোন লোভের বশবতীঁ হয়ে কোন শয়তানের কাছে মাথা নত করি নাই। কোনদিন ফাঁসির কাষ্ঠে বসেও বাংলার মানুষের সঙ্গে বেঈমানী করি নাই।

আমি বিশ্বাস করি তোমরা আমার কথা শুনবা, তোমরা আত্মসমালোচনা কর, আত্মসংঘম কর। তোমরা আত্মশুদ্ধি কর। দুই চারটা পাঁচটা লোক অন্যায় করে, যার জন্য এতো বড় প্রতিষ্ঠান_যে প্রতিষ্ঠান ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, যে প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা এনেছে, যে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ লক্ষ কর্মী জীবন দিয়েছে, যে প্রতিষ্ঠান ২৫ বছর পর্যন্ত এতিহাসিক সংঘাম করেছে_ তার বদনাম হতে দেওয়া চলে না। আজ বাংলার নিভৃত কোণে আমার এক কর্মী পড়ে আছে, যার জামা নাই, কাপড় নাই । তারা আমার কাছে আসে না।

আপনাদের অনেকেই এখানে আছেন। কিন্তু আমি যদি চর অঞ্চলে গুরতে যাই_ আমার এ ধরণের কমীকে আজও দেখি। আমি যদি কক্সবাজার যাই, আমার গ্রামের একটা কর্মীকে দেখি । এদের সঙ্গে আমার রক্তের সম্বন্ধ । আজও আমি দেখি তার পরনে ছেঁড়া লুঙ্গি । আজও দেখি, সেই ছেঁড়া পায়জামা, ছেঁড়া শার্ট, রায়ে হিতানাহিন বাজাছ্রনে ামারগেদরাভাাম লা কর্মী পড়ে আছে। কিন্ত কিছু কিছু লোক যখন মধু-মক্ষির গন্ধ পায়, তখন তারা এসে আওয়ামীলীগে ভীড় জমায়। আওয়ামীলীগের নামে লুটতরাজ করে।

পারমিট নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করে। আওয়ামীলীগ কর্মীরা, আওয়ামী লীগ থেকে তাদের উৎখাত করে দিতে হবে_ আওয়ামীলীগে থাকার তাদের অধিকার নাই। তাই বলছি, আত্মসমালোচনার প্রয়োজন আছে, আজ আত্মসংযমের প্রয়োজন আছে, আজ আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন আছে। তোমরা, আওয়ামীলীগের কাউন্সিলাররা আজ যারা এখানে বসেছ, তারা মনে মনে চিন্তা কর। বুকে হাত দিয়ে খোদার উপর নির্ভর কইরা বল যে, আমরা মানুষকে ভালবাসি । আমরা বাংলার মানুষকে ভালবাসি । আমরা ২৫ বছর সংগ্রাম করেছি। আমরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছি। আমরা ইতিহাস রাখবো । আমরা নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবো। আমরা দেশকে মুক্ত করবো।

তাহলেই  আওয়ামীলীগের ইতিহাস থাকবে। তাহলে মরেও আমি শাস্তি পাব। তা না হলে আমার বড় দুঃখ, বড় কষ্ট । সহকর্মী ভাইয়েরা বোনেরা, নীতি ছাড়া, আদর্শ ছাড়া এবং যে কথা আমি বলেছিলাম_আত্মসমালোচনা আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি  ছাড়া তা হ না। ন্যায়নীতির আদর্শ সামনে রাখতে হবে। সে আদর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

শক্র মোনাফেক

ভুলে যেয়ো না। স্বাধীনতা পেয়েছো এক রকমের শক্রুর সাথে ফাইট করে। তখন আমরা জানতাম, আমাদের এক নম্বর শত্রু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও শোবকগোষ্ঠী। কিন্তু এখন শক্রুকে চেনা বড় কষ্টকর । আমি একদিন গল্প করতে গিয়ে বলেছিলাম, জীবনে আমি তিনটি জিনিসকে ভয় পাই, আর কাউকে আমি ভয় পাই না। একটা হলো কুমীর- নদীতে থাকে। পানির মধ্যে গোসল করতে গেলে পা ধরে টান দিয়ে নিয়ে যায়। তার সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারি না। দ্বিতীয়টা সাপ, ফস করে মেরে দিলে যুদ্ধ করতে পারি না।

আর তৃতীয়টা মোনাফেক! তোমরা আগে যুদ্ধ করেছো কিন্তু এখন বাংলার মাটিতে এদের সঙ্গে সামনা-সামনি যুদ্ধ করার উপায় নাই। তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে মোনাফেক, তোমাদের সাথে যুদ্ধ করছে কেউটে সাপ আর পানির তলে কুমীর। এরা রাতের অন্ধকারে গুলী করে। কেউটে সাপ আর পানির তলে কুমীর। এরা রাতের অন্ধকারে গুলী করে মারে, আর বলে রাজনীতি করে। রাত্রে একজন লোক শুয়ে আছে, তাকে জানালা দিয়ে গুলি করে মারল। বলে আমি বিপ্লবী।

তুমি বিগ্রবী, না দাগী চোর? যে কোন সময় যে কোন মানুষকে গুলি করে মারা যায়! এটা কি বিপ্লব? তোমরা রাত্রে গুলি করে মারো, আমরা প্রস্তাব পাশ করি। আর আমি যদি লোকদের বলে দেই যে, তোমরাও রাত্রে গুলি করে মারো, তখন কি হবে? এদের কোন নীতি নাই, এদের কোন আদর্শ নাই, এদের কিছুই নাই। এরা বড় বড় কথা বলে। আসলে চোর-ডাকাতের ন্যায় হাট বাজারে ডাকাতি করে জিন্দাবাদ দিয়ে চলে যায়। সব ডাকাত, সব চোর। হাট বাজার, চিনির দোকানে, মুরগীর দোকানে, শজীর দোকানে ডাকাতি করে বিপ্লব হয় না। এ রণদিভের থিওরী ইট মারো, সেপাইর আস্তানায় ইট মারো, ওয়ালে একটা পাথর মারো, এতে বিপ্লব হয় না।

সেই জন্যই আমি বলতে চাই যে, তাকে বিপ্রব বলে না, তাকে বলে পারভাদশান   পাভার্সান, বিপ্লবের বিকৃতি। এই যত বিপ্লবীরা সমাজতান্ত্রিক দেশের. : প্রতিনিধিরা আমার পাশে বসে আছেন, বহু বিপ্লব করছেন, এরা ফাউগ্ার্স অব দি বিপ্লব (বিপ্বের প্রতিষ্ঠাতা), সেটা এদের কাছে থেকে জেনে নাও। জনগণকে ছাড়া, গণবিপ্লব -ছাড়া বিপ্লব হয় না। রাতের অন্ধকারে গুলি মাইরা কোনদিন বিপ্লব হয় নাই। পড় সোভিয়েট রাশিয়ার বিপ্লবের ইতিহাস, পড় অন্যান্য দেশের বিপ্রবের ইতিহাস, পড় আমেরিকার স্বাধীনতা সংঘামের ইতিহাস।

দেখ সেখানে কি হয়েছে। দেখ আমাদের এই সাব- কণ্টিনেন্টে কি হয়েছে। পড়, জান, শেখ, বোঝ । তারপরে বিপ্লবের কথা বল। বিপ্লব রাতের অন্ধকারে গুলি কইরা, টেরোরিজম কইরা হয় না। আবার এখন একটা সুবিধা হয়েছে, রাত্রের অন্ধকারে গুলি করে মাইরা বলে- আমরা মাওবাদী । কিন্তু আমি জানি, তোমরা চোর আর গুপ্তা ছাড়া আর কিছু না। তাই আপনাদের কাছে আমি বলতেছিলাম যে, আপনাদের চারটা আদর্শ-যেটা রাষ্ট্রীয় আদর্শ এবং আওয়ামীলীগের আদর্শ সেটা প্রতিষ্ঠিত রাখতে হবে।

গণতন্ত্র না সন্ত্রাস একদল লোক গণতান্ত্রিক পন্থাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে। আমরা গণতন্ত্র বিশ্বাস করি। আমরা গণতান্ত্রিক অধিকার দিয়েছি। পাঁচ বৎসর পর নির্বাচন কর। যদি নির্বাচনে তোমরা কেউ আসতে পার, যেকোন দল মেহেরবানি করে চলে আসে । অওয়ামীলীগ গদি ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু তোমরা জান, যে যতই বক্তৃতা কর, আর মানুষ যতই বক্তৃতা শুনুক না কেন ভোট দেবার সময় তোমাদের অবস্থা যা আছে-আগেও যা হয়েছে পরেও তাই হবে । সে জন্যই তোমরা জনগণের উপর আস্থা রাখ না।

একদিকে গণতান্ত্রিক অধিকারকে ব্যবহার করব আর অন্যদিকে রাতের অন্ধকারে আওয়ামীলীগ কমীকে মারবো, প্রগতিশীল কর্মীকে বিপ্লব করবো। কোন স্বাধীন দেশ কোন গণতান্ত্রিক দেশে এটা এলাউ করা যায় না। বহু সহ্য করা হয়েছে। দুই বৎসর সহ্য করা হয়েছে। বলা হয়, বঙ্গবন্ধু কঠোর হও । বঙ্গবন্ধু কঠোর কিনা আইয়ুব খান ইয়াহিয়া খান, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী নসরুল্লাহ খান লিয়াকত আলী খান সবাই জানেন ।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু চেয়েছিল কি? বাংলার মানুষ তাকে জাতির পিতা করেছে। বাংলার মানুষ তাকে প্রধানমন্ত্রী করেছে। বাংলার মানুষকে আমি বুঝবার চেষ্টা করেছি। তাদের বলতে চেষ্টা করেছি, তোমরা কাজ কর। তোমরা গণতন্ত্রের পথ অবলম্বন কর। দুটো খেলার অধিকার তোমাদের নাই। গণতান্ত্রিক অধিকারও তোমরা ব্যবহার -করবা আর বিপ্রবের কথা বলে রাতের অন্ধকারে গুলী মারবা, অস্ত্র ফেরত দেবা না, সে অধিকার তোমাদের নাই, সে অধিকার তোমাদের দেওয়া হবে না।

 

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ৩য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ
১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ৩য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ৩য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

এটা মনে রাখা দরকার সহ্যের সীমা অতিক্রম করে যাওয়া হয়েছে। জনগণ দেখতে চাও, জনগণ দেখবা । কয়েক হাজার লোক মিটিং-এ যোগদান করলেই মনে করো না যে হয়েছে। এখনও আওয়ামীলীগ ডাক দিলে রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ লোক এসে হাজির হবে। মনে কর না যেন বড় একটা কিছু হয়ে গেছে। সাবধান হয়ে যাও । একদল বলে অমুক তারিখ থেকে সশস্ত্র বিপ্রব শুরু কর। তারপরেও আমি কিছু বলি না। তবুও তারা বলে কি যে, আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে হাত দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু তোমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার নাই, থাকতে পারে না। নইলে আওয়ামীলীগ কর্মীরা অন্ধকারে মরে? আওয়ামী লীগ কর্মী এবং প্রগতিশীল কর্মী যারা স্বাধীনতা সংগাম করেছে, আমি তাদের কাছে অস্ত্র চেয়েছিলাম । তারা অস্ত্র জমা দিয়েছে। কিন্ত তোমরা গোপনে কিছু কিছু অস্ত্র রেখে দিয়েছো এবং সেগুলি গোপনে ব্যবহার করছো । আজ যদি আওয়ামীলীগ কর্মী বা প্রগতিশীল কমীর কাছে একদিন অস্ত্র দিয়ে দেওয়া হয়_ তা হলে একজনের অস্তি তৃও বাংলাদেশে থাকবে না। আমাকে বাধ্য করো না।

দেশের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করো না, যাও গণতন্ত্রের অধিকার আছে বক্তৃতা কর। বাই-ইলেকশন হবে, ইলেকশনে নামো। ইউনিয়ন কাউন্সিল ইলেকশনে জিততে পারে না, রাত্রিবেলা এসে চেয়ারম্যানকে গুলী করে মারে। কয়- কি করলাম? বিপ্রব করলাম। কি বিপ্রবঃ চেয়ারম্যান মারছে । বাবা এতো শুনি নাই। আমার মনে হয় এখানে যত দেশের লোকেরা আছেন, যদি শোনেন সবাই হাসবেন । কারণ, তাহলে বিপ্লবের ইতিহাস বদলিয়ে লিখতে হবে।

কর্মীদের কর্তব্য

আজ সেই জন্য আওয়ামীলীগ কর্মীদের কাছে আমার কথা যে, তোমাদের কর্তব্য রয়েছে। স্বাধীনতা এনেছ। এবার খোদাকে হাজের নাজের রেখে এই প্রতিজ্ঞা করে যেতে হবে যে, বাংলার মানুষকে সুখী করতে হবে আমার ।বাংলার দুঃখী মানুষের পাশে এসে দীড়াতে হবে। দুর্নীতি উৎখাত করতে হবে। শোষণহীন সমাজ করতে হবে । যে রাষ্ট্রীয় চার আদর্শ আছে, তাকে পরিপূর্ণ করতে হবে। এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে হবে। তাহলেই তোমাদের আদর্শ পূর্ণ হবে- এর আগে নয়। ত্যাগের প্রয়োজন ।

যারা ত্যাগ করে, তারা জীবনভর করে। তোমরা ত্যাগ করছো আরও করবা । আর যারা মজা মারে, তারা এমনিও মারে, অমনিও মারে । সেজন্য তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ আছে কর্মীরা তোমাদের কাছে আমার দাবী আছে। তোমরা জীবনে আমার চোখের সামনে কোনদিন কথা বল নাই। যা বলেছি তোমরা তাই করেছ। তোমরা হাসতে হাসতে মৃত্যুযুখে দীড়িয়েছ। তোমরা পারবা না আমার কথা শুনতে? দূর্ণীতি আমরা দেখব না, দূর্ীতি আমরা করব না, দুর্নীতি এদেশ থেকে তাড়িয়ে দেবো।

তোমরা পারবা না এদেশের -মানুষকে ভালবাসবার? আমরা দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করবো । এদেশের মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে চায়, আমরা শান্তি দেব। পারবা না তোমরা এ কাজ করতে? বল আমার কাছে। না পার আমাকে বিদায় দিয়ে দাও । আমি কিছু চাই না তোমাদের কাছ থেকে। সহকর্মী ভাইয়েরা, আমি বলে দিচ্ছি, আমি সেন্টিমেন্টালী বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে গ্যাটাচড। কথাটা তোমাদের পরিষ্কার বলে দেবার চাই। তোমরা সকলে জান যে, প্রধান মন্ত্রীত্র জন্য আমি রাজনীতি করি নাই।

তোমরা জানতা ইচ্ছা করলে আমি বহু আগে প্রধানমন্ত্রী হতে পারতাম । এ প্রধানমন্ত্রীত্ব আমার কাছে কীটা বলে মনে হয়। আমি যদি বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে না পারি, আমি যদি দেখি বাংলার মানুষ দুঃখী, আর যদি দেখি বাংলার মানুষ পেট ভরে খায় নাই, তাহলে আমি শান্তিতে মরতে পারবো না-পারবো না… পারবো না। আমার জীবন বৃথা হয়ে যাবে। জন্য। আমি ওদের কাছে থাকতে চাই, ওদের কাছে থাকতে চাই, ওদের সঙ্গে সঙ্গে মরতে চাই, এর বেশী আমি আর কিছু চাই না।

 

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ৩য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ
১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ৩য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

গণতন্ত্রের পথে সমাজতন্ত্র

তাই তোমাদের আমার অনুরোধ, তোমরা শুধু পার আমার অনুরোধ রাখতে, কারণ তোমরা আমার বহু দুর্দীনের কর্মী। ১৯৪৯ সাল থেকে তোমরা এ পর্যন্ত আপদ, বিপদ, মুসিবত, অত্যাচার, অবিচার, জুলুম, গুলি সব অগ্রাহ্য করে আমার পাশে দীড়িয়েছ বাংলার মানুষকে স্বাধীন করার জন্য। স্বাধীন তোমরা করেছ। এবার বাংলার মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। দিতে হবে অর্থনৈতিক মুক্তি, সমাজতান্ত্রিক সমাজ । সমাজতন্ত্র ছাড়া রাস্তা নাই। শোষণহীন সমাজ গাছ থেকে পড়ে না।

শোষণহীন সমাজ বা সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সমাজ গড়তে হলে আমার কর্মী ভাইদের সমাজতন্ত্রের কর্মী হতে হবে। ক্যাডার তৈরী করতে হবে। ট্রেনিং দিতে হবে । না হলে পারব না কিছু করতে। তোমাদের নিঃস্বার্থ কর্মী হয়ে ট্রেনিং নিতে হবে । সমাজতন্ত্রে আমরা গণতন্ত্রের মাধ্যমে যাবার চাই এবং আমরা দুনিয়াকে দেখাতে চাই যে, গণতান্ত্রিক পন্থায় নতুন সিস্টেমে আমরা শোষণহীন সমাজ গড়ে তুলবো । আমরা বাঙ্গালী । আমরা জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করি। আমি যদি ভূলে যাই যে আমি বাঙ্গালী, সেদিন আমি শেষ হয়ে যাবো ।

আমি বাঙ্গালী। বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ, বাংলার মাটি আমার প্রাণের মাটি,বাংলার মাটিতে আমি মরবো। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, আমার কৃষ্টি ও সভ্যতা এই বাঙালী জাতীয়তাবাদ-_তোমাদের মনে রাখতে হবে ।

সমাজতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকতা

আর একটা জিনিস। রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি করে, যারা সাম্প্রদায়িক_ তারা হীন, নীচ, তাদের অন্তর ছোট । যে মানুষকে ভালবাসে, সে কোনদিন সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। আপনারা যারা এখানে মুসলমান আছেন, তীরা জানেন যে, খোদা যিনি আছেন তিনি রাব্বুল আলামীন-রাব্তুল মুসলেমিন নন। হিন্দু হোক, খ্রিস্টান হোক, মুসলমান হোক, বৌদ্ধ হোক-_ সমস্ত মানুষ তার কাছে সমান। সেই জন্যই এক মুখে সোস্যালিজম ও প্রগতির কথা এবং আর এক মুখে সাম্প্রদীয়িকতা চলতে পারে না।

সমাজতন্ত্র প্রগতি আর সাম্প্রদায়িকতা পাশাপাশি চলতে পারে না। একটা হচ্ছে পূর্ব আর একটা হচ্ছে পশ্চিম। যারা এই বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা করতে চায়, তাদের সম্পর্কে সাবধান হয়ে যেও। আওয়ামী লীগের কর্মীরা, তোমরা কোনদিন সাম্প্রদায়িকতাকে পছন্দ কর নাই। তোমরা জীবনভর তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছ। তোমাদের জীবন থাকতে যেন বাংলার মাটিতে আর কেউ সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করতে না পারে। তোমাদের মনে রাখা দরকার, সেজন্য আমাদের রাস্তা ক্লিয়ার ।

 

আমাদের জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষতার মধ্যে কোন কিন্তু নাই। সে সমাজতন্ত্র হলো আমার অর্থনীতি। একে গড়তে হলে করমীদের সমাজতান্ত্রিক কর্মী হতে হবে, ক্যাডার হতে হবে, ট্রেনিং নিতে হবে । তাহলেই আমরা সফল হবো । অবশ্য অনেক লোক আছে, যারা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিকে গ্রহণ করতে পারে নাই। তারা পিছন থেকে পিছু ঢেলা মারার চেষ্টা করছে। যারা প্রগতির নামে সাম্প্রদায়িকতা করছে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের রুখে দীড়াতে হবে। গ্রামে গ্রামে দেশের মানুষকে সংঘবদ্ধ করে বোঝাতে হবে, একেই বলে সমাজতন্ত্র । একেই বলে শোষণহীন সমাজ । একেই বলে সুষম বন্টন। তাহলে বাংলার মানুষ তোমাদের পিছনে থাকবে ।

পররাষ্ট্র নীতি

সহকর্মী ভাই ও বোনেরা, আওয়ামীলীগ পার্টি দীর্ঘদিন ধরে যে বৈদেশিক নীতি দিয়েছে, আমার মনে হয় আপনাদের এই সরকার_ সেই নীতি যুগোস্রাভিয়া ও অন্যান্য যেসব দেশ স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের সাহায্য করেছেন আজ তীদের কথা স্মরণ করি। এছাড়াও এঁ সমস্ত দেশের কথা স্মরণ করি, যারা বিপ্রবের পরেও আমাদের ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠনে জার্মানী, জি, ডি, আর, ফ্রান্স, স্থ্যাপ্তিনেভিয়ান কান্ট্রি এবং আরো বিতিন্ন দেশ। সাহায্য করেছেন সমস্ত সোস্যলিষ্ট কান্ট্র। তাদের সঙ্গে আমাদের রিলেশন ভাল হয়েছে।

আমরা আজ গর্বিত যে, মধ্যপ্রাচ্যে আমরা আরব ভাইদের এবং হস্তক্ষেপ করেছে। ইসরাইলীরা জাতিসংঘের প্রস্তাব মানে নাই । তারা দখল করে বসে আছে আরবদের জমি, আরব ভাইদের একথা বলে দেবার চাই এবং তারা প্রমাণ পেয়েছে যে, বাংলার মানুষ তাদের পিছনে রয়েছে। আরব সাহায্য করবো । যেসব দেশ আমাদের সাহায্য দিয়েছে, আমি আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে তাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাই। শান্তিপূর্ণ দেশ সহঅবস্থানে বিশ্বাস

করে আমি বিশ্বাস করি নন-অ্যালাইগু, ইপ্ডিপেপ্ডেন্ট ফরেন পলিসি । আমরা কারুর পকেটে যাবার চাই না। আমরা সকলের বন্ধুত্ব কামনা করি। কিন্তু আমাকে দুঃখের “সঙ্গে বলতে হয় একটা দেশ পাকিস্তান শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানে বিশ্বাসী নয় ।

 

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ৩য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ
১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ৩য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

আত্তসম্মানের বিনিময়ে বন্ধুত্ত নই

যে চীন নিজেকে মহান দেশ বলে এবং দুঃখী মানুষের বন্ধু বলে গর্ব করে, সে চীন সম্পর্কে আমার একটা কথা বলার আছে। চীনের সঙ্গে আমরা বন্ধুত্ব কামনা করি । কিন্ত আত্মসম্মান বিক্রি করে আমরা কারো সঙ্গে বন্ধুত করতে চাই না। আমরা এমন কিছু করি নাই, যে জন্য চীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে ভোটো দিতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয় চীন বাংলার বিরুদ্ধে ভেটো দিয়েছে। আমরা সেজন্য দুঃখিত। তবুও চীন অনেক বড় দেশ, আমরা তাদের বন্ধুত্ব কামনা করি। কিন্তু চীন একটা সাম্রাজ্যবাদী ও ক্যাপিটালিস্ট দেশ।

পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে। আর বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ, যারা রক্ত দিয়ে বিপ্ৰ করে দেশকে স্বাধীন করেছে, তারা যাতে জাতিসংঘে স্থান না পায়_- সেজন্য চীন জাতিসংঘে ভোটো দিল বাংলার বিরুদ্ধে । ইতিহাস বড় তাৎপর্যপূর্ণ । যখন চীনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে ভেটো দেওয়া হতো_ তখন এই বাংলার মানুষই বিক্ষোভ করতো । আমি নিজে এ ভোটের বিরুদ্ধে বহুবার কথা বলেছি_ যে ভোটের জন্য চীন ২৫ বৎসর জাতিসংঘে যেতে পারে নাই, দুঃখের বিষয়, সেই চীন আজ ভোটো “ফাওয়ার” হয়ে প্রথম ভোট দিলো আমার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে।

তবুও আমি কামনা করি তাদের বন্ধৃত্। অনেক বড় দেশ। দুশমনি করতে চাই না। বন্ধুত্‌ কামনা করি। কারণ আমি সকলের বন্ধৃত্‌ চাই। কিন্তু জানি না, আমার এই কামনায়, আমাদের এই প্রার্থনায় তারা সাড়া দেবেন কি না। যদি না দেয় কিছু আসে যায় না। ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা এত ছোট দেশ নই। বাংলাদেশ এতটুকু নয়। পপুলেশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ দুনিয়ার অষ্টম বৃহত্তম রাষ্ট্র । আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। এ স্বাধীনতা আমরা আলোচনা করে বা রাউণ্ড টেবিল কনফারেস করে আনি নাই ।

সেজন্য আজ আমাদের পরিষ্কার কথা-আফ্রিকা হোক, ল্যাটিন আমেরিকা হোক, আরব দেশ হোক, যেখানে মানুষ শোষিত, সেখানে মানুষ অত্যাচারিত, যেখানে মানুষ দুঃখী, যেখানে মানুষ সাম্রাজ্যবাদীর দ্বারা নির্যাতিত, আমরা বাংলার মানুষ সেই দুঃখী মানুষের সাথে আছি এবং থাকবো । আমাদের নীতির পরিবর্তন হবে না। আওয়ামীলীগের নেতারা এটা নিশ্চয়ই আপনাদের নীতি । আমাদের সরকারের তরফ থেকে এটা পালন করা হচ্ছে।

আর্থিক অবস্থা

আজ আমাদের দেশের আর্থিক অবস্থা বড়ই খারাপ। অর্থনৈতিক অবস্থা বেশী ভাল নয়। কেন? ২৫ বছর শোষণ করে সব নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিনা পয়সায় বিনা বৈদেশিক মুদ্রায় সরকার চালাতে হচ্ছে। সাড়ে সাত কোটি লোকের দেশ। সব কিছু বিধ্বস্ত। একে গড়া এত সোজা নয়। তাছাড়া দুনিয়াতে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আমাদের মত যারা উন্নয়নশীল দেশ, যারা দেশকে গড়ে তুলতে চায়, তারা মহা বিপদের সম্মুখীন। আমাদের কষ্ট হবে। তবুও একটা কথা মনে রাখা দরকার যে সাহায্য আমি চাই, আওয়ামী লীগ যে সাহায্য চায়_ তা আত্মসম্মান বিক্রি করে নয়।

আওয়ামী লীগ সরকার সেই সাহায্য গ্রহণ করতে পারে না। বাংলাদেশের মানুষ গ্রহণ করতে পারে না । আমাদের কেউ যদি কিনতে চান ভুল হবে। কেউ যদি সাহায্যের নামে আমাদের দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, তবে ভুল হবে। আমরা শোষিত মানুষ । বহু ত্যাগ করেছি। বহু রক্ত দিয়েছি। দরকার হয় আরও দেব। কিন্ত আত্মসম্মান বিক্রি করে আমরা – কারো কাছে সাহায্য চাই না। যারা বন্ধু হিসাবে সাহায্য করতে চান_ তারা আমার ভাই । আসুন, আমরা সাহায্য নিশ্চই গ্রহণ করবো । কারণ দেশের মানুষকে বাচাতে হবে। আমার দেশকে গড়ে হবে ।

দুর্নীতি

আজ সত্য কথা বলতে কি_ আমাদের একটা কথা মনে রাখা দরকার । আওয়ামীলীগ কর্মীরা, কোথায় যেন গোড়ায় একটু গলদ রয়ে গেছে। মানুষ এতো অর্থের জন্য পাগল হয়েছে কেন? শুধু টাকা কামাই করবে কি করে, এই চেষ্টা। একদিন হাসতে হাসতে বল্লাম যে, বাংলার কৃষক, বাংলার দুঃখী মানুষ_ এরা কিন্ত অসৎ নয় । ব্লাকমার্কেটিং করে কারা? রাগ করবেন না। আপনারা শিক্ষিত, বুদ্ধিমান, চিন্তাশীল, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় আছেন, আপনারা রাগ করবেন না। ব্লাকমার্কেটিং কারা করে? যাদের পেটের মধ্যে

দুই কলম বিদ্যা হয়েছে তারাই করে। ইন্টারনেশনাল স্মাগলিং তারাই করে। বিদেশে টাকা রাখে তারাই । আমরা যারা শিক্ষিত, আমরা যারা বুদ্ধিমান, ওঁষধের মধ্যে ভেজাল দিয়ে বিষাক্ত করে মানুষকে খাওয়াই_ তারাই। নিশ্চই গ্রামের লোক এসব পারে না, নিশ্চয় আমার কৃষক ভাইরা পারে না। নিশ্চয়ই আমার শ্রমিক ভাইরা পারে না। পেটের মধ্যে যাদের বুদ্ধি বেশী আছে, তারাই ব্ল্যাক-মার্কেটিয়ার।

আর বিদেশী এজেন্ট কারা হয়? নিশ্চই আমার কৃষক নয়, নিশ্চয়ই আমার শ্রমিক নয়। আমরা যারা মিশতে পারি, ভাল স্যুট পরতে পারি, তারাই বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে বিদেশের এজেন্ট হই। মহা বিপদের মধ্যে আছি আমরা । আপনারা যারা বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিতা, যারা দেশকে নেতৃত্ব দেন- তাদের কর্তব্য হবে আত্মসমালোচনা করা । আর আওয়ামীলীগের সহকর্মী ভাইয়েরা, তোমরা মার্কেটিয়ারদের পিছনে লাগো। হোর্ডারদের পিছনে লাগো। ঘুবখোরদের পেছনে লাগো।

তোমরা আমার কথায় আগেও লেগেছো, এখনো লাগো। শুধু আইন দিয়ে, শুধু শক্তি দিয়ে দূর্ণীতি দমন করা যায় না। এজন্য এমনভাবে জনমত সৃষ্টি করতে হবে, যেমনভাবে ১লা মার্চ থেকে ২৫্শে মার্চ পর্যন্ত জনমত সৃষ্টি করে আমরা আন্দোলন করেছিলাম । যেমনভাবে ২৫শে মার্চ থেকে ন’মাস পর্যন্ত জনমত সৃষ্টি করে স্বাধীনতা সংখ্াম করেছিলাম । তেমনি বাংলার মাটিতে জনমত সৃষ্টি করতে হবে- দূর্ণীতিবাজ, ঘুষখোর ও শোষকদের বিরুদ্ধে । আমি বিশ্বাস করি তাহলে বাংলাদেশ থেকে দূীতি উঠে যাবে ।

গণ এঁক্য জোট করেছেন আপনারা । আওয়ামীলীগের সংগে কমিউনিষ্ট পার্টি ও ন্যাপ আছে। এ ছাড়া আওয়ামীলীগের সাথে কর্মী আছে পাঁচটি গ্রুপে -আওয়ামীলীগ, শ্রমিকলীগ, কৃষকলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ । আমি মাঝে মাঝে খবর পাই- ভুল বোঝাবুঝি হয়। কোন ভুল বোঝাবুঝি হতে পারবে না। সবার সাথে আলোচনা করে নিয়ে আপনাদের পাঁচ গ্রুপকে এক সাথে কাজ করতে হবে। আপনারা কাজ করছেন দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য। সেইজন্য সংঘবদ্ধভাবে বসে আলোচনা করে আপনাদের কাজ করতে হবে। কারণ, আদর্শ আপনাদের এক। নেতৃত্ব আপনাদের এক! কর্মী আপনারা এক । সম্মুখে রাস্তা আপনাদের এক । গভর্ণমেন্ট আপনাদের এক।

 

১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ৩য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ
১৮ জানুয়ারী ১৯৭৪ ৩য় সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাওন্সিল অধিবেশনে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধু উদ্বোধনী ভাষণ

 

উৎপাদন বাড়াতে হবে

ভাইয়েরা আমার, পরিশ্রম না করলে, কঠোর পরিশ্রম না করলে সাড়ে সাত কোটি লোকের ৫৪ হাজার বর্গমাইল এলাকার এই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি করা যাবে না। ভিক্ষুক জাতির ইজ্জত থাকে না। বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে এনে দেশকে গড়া যাবে না। দেশের মধ্যেই পয়দা করতে হবে। শ্রমিক ভাইদের কাছে আমার অনুরোধ । তোমাদের বার বার বলেছি, এখনো বলছি, প্রোডাকশন বাড়াও। সমাজতন্ত্রের অর্থ এবং যে প্রোডাকশন বাড়াও, ভোগ কর। একবার এক মিটিংয়ে বলেছিলাম, গাইটা খেয়ো না, দুধ খাও। তোমরা কিছু লোক যা আরম্ভ করেছো, দুধও খাবার চাও, গাইও খাবার চাও।

সেজন্যই বলছি প্রোডাকশন কর । আমি শ্রমিক ভাইদের সবাইকে দোষ দেই না। অনেক শ্রমিক প্রতিষ্ঠান আছে, যারা ভাল প্রোডাকশন করছে, ভাল কাজ করছে। কৃষক ভাইরাও এগিয়ে এসেছে। তাদের অর্গানাইজ করতে হবে। এমন কি একথা ছাত্র ভাইদেরও বলি। দেখুন বগুড়ায় গিয়ে কলেজের ছাত্ররা নিজেরা মাঠ চাষ করে। নিজের খরচ নিজেরাই কামাই করে লেখাপড়া আরম্ভ করে দিয়েছে। আপনারাও শুরু করেন। বাপ-মার উপর ট্যাক্স কম করেন। আজকে জিনিসের দাম দিন দিন বাড়ছে।

বিদেশ থেকে আনতে হয়। দেশে ইনক্রেশন হচ্ছে। মানুষের দুঃখ হবে। সেজন্য আজ আপনাদের এদিকে নজর দিতে হবে । আমি আপনাদের কাছে আজ আর বেশীক্ষণ বক্তৃতা করছি না। ইতিহাস বলে দেওয়ার দরকার ছিলো বলেই এত কথা বলেছি। আমি তোমাদের পরিষ্কার বলতে চাই, আমি আওয়ামীলীগের সভাপতি থাকতে পারবো না। তোমাদের নতুন সভাপতি করতে হবে। কারণ, সময় আমি দেবার পারি না।

দ্বিতীয়তঃ আওয়ামীলীগের কার্ষপ্রণালীর মধ্যে যেটা আমি নিজে পাশ করিয়েছিলাম তাতে পরিষ্কার বলা ছিল যে, প্রধানমন্ত্রী বা গভর্ণর হলে কেউই আওয়ামীলীগের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারী বা কর্মকর্তা হতে পারবে না। এটাকে আমি পরিবর্তন করতে চাই না। আমি নিশ্চই বিশ্বাস করি যে, তোমরা আমার কথা রাখবা এবং আমার কথা শোনবা। আমি সব ঠিক করে দেব, তোমরা চিন্তা কর না-গোছায়ে গোছায়ে ঠিক করে দেব। সারা জীবন আমার কথা শুনেছো, এবারও শুনতে হবে।

মানুষের পাশে দাঁড়াও

আমি আগেই বলেছি যে, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের যা প্রয়োজন, আওয়ামী লীগের সেই চারটি জিনিস-নেতৃত্, আদর্শ, সৎ ও নিঃস্বার্থ কর্মী রয়েছে । আমরা আওয়ামীলীগ স্বাধীনতা সংগ্রামে জয়লাভ করেছি । আজ যে নতুন সংগ্রাম শুরু হয়েছে_দেশ গড়ার সংগ্রাম, দুঃখী মানুষকে বীচাবার সংগ্রাম-এই সংগ্রামেও আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বাস করি, যদি আওয়ামী লীগ কর্মীরা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে, তা হলে নিশ্চয়ই আমরা কামিয়া হবো । কেউ আমাদেরকে ঠেকাতে পারবে না । বিশৃঙ্খলাকারীরা কোন ক্ষতি করতে পারবে না।

তাই আজকে তোমাদের কাছে আমার আবেদন রইল- এামে গ্রামে কাজ করো । দুঃখের দিনে মানুষের পাশে দীড়াও। তোমরা আমার কথা শুনেছ, এখনো আমার কথা শোন । তোমাদের যা বলি সেভাবে কাজ কর। আমি যেখানেই থাকি তোমাদের সাথেই থাকবো, তোমাদের গাশেই থাকবো । তোমাদের বাদ দিয়ে একদিনও আমি বাচতে পারি না। কন্তু সভাপতি আমি থাকতে পারবো না।

আমি আমার পক্ষ থেকে, আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে যারা বিদেশ থেকে এখানে এসেছেন, সেই ঘুগোস্রাভিয়া, পোল্যাণ্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপান, বুলগেরিয়া, পূর্ব জার্মানী, ভারত, রুমানিয়া, ইরাক, মালয়েশিয়া, হাঙ্গেরী ও দক্ষিণ ইয়মেনের প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ দিচছি। যারা আসতে পারেন নি বলে আমাদের জানিয়েছেন এবং যীরা এখানে কুটনৈতিক প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত নয়েছেন_ তাদের সকলকেও আমি আন্তরিক ধন্যবাদ দিচ্ছি।

-আমি মাপনাদের অনেক সময় নষ্ট করেছি এইজন্য যে, আজ প্রয়োজন ছিলো মাওয়ামী লীগের কিছু ইতিহাস বলার, প্রয়োজন ছিলো আপনাদের কিছু পথ দেখানোর । শুধু একটা কথা বলে যাই-শেষ কথা আমার, যে কথা আমি নার বার বলেছি_সোনার বাংলা গড়তে হবে। এটা বাংলার জনগণের কাছে আওয়ামীলীগের প্রতিজ্ঞা । আমার আওয়ামী লীগের করমীরা, যখন বাংলার মানুষকে বলি তোমরা সোনার মানুষ হও; তখন তোমাদেরই প্রথম সোনার মানুষ হতে হবে। তাহলেই সোনার বাংলা গড়তে পারবা । আর যারা দুঃখী মানুষের পাশে দীড়িয়ে সংগ্রাম করেছো, তারা বাংলার দুঃখী মানুষের কাছ (একে সরে যেয়ো না )

জয় বাংলা । জয় আওয়ামীলীগ

 

আরও পরুন :

মন্তব্য করুন