২১ জুলাই ১৯৭৫ – বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণঃ কি উদ্দেশ্যে আপনারা এখানে এসেছেন, সকলেই জানেন। তবু আমি দুই একটা কথা আপনাদের সাথে আলোচনা করতে চাই। কারণ, আপনারা যারা নবনিযুক্ত গভর্ণর- তাদের প্রায় দুই-তিন সপ্তাহ প্রশিক্ষণ হবে এবং নানা বিষয় তাদের শিখতে হবে, জানতে হবে।

 

২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

যারা বহুদিন যাবৎ আমার সহকর্মী, তারা জানেন, স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরে বার বার আপনাদের সাথে আলোচনা করেছি এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেও দেখেছি যে, প্রশাসনিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন দরকার। যে কোন কারণেই হোক, ইংরেজ যে শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেছিল, সেটা শাসন বা শোষণ করবার জন্যই কায়েম করেছিল । কিন্তু আমরা স্বাধীনতা পেলাম, আমাদের চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল।

বহুদিন পর্যস্ত পুরনো আমলের মনোভাব নিয়ে আমরা কাজ করেছি। যে ট্রেনিং আমরা আগে পেয়েছি, সেটা পুরনো ঘুণে ধরা সিস্টেম ছাড়া আর কিছু নয়। আপনারা আজ জনগণের শাসক নন। আজ আমরা স্বাধীনতা এনেছি। আজকে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম সরকার পরিচালনা করছি। আমরা এ দেশের শাসক নই, আমরা এ দেশের সেবক- একথা মনে রাখতে হবে । জনগণের সেবার জন্যই আমরা নির্বাচিত হয়েছি এবং তাদের সেবাতেই আমাদের আত্মনিয়োগ করতে হবে।

আপনারা যারা বহুদিন যাবৎ এ দেশের শাসনের সাথে বা প্রশাসনের সাথে জড়িত আছেন, তারা দেখেছেন- অভিজ্ঞতা থেকে দেখছেন, কাজের মাধ্যমে দেখেছেন যে, জনগণ থেকে আমাদের শাসন কাঠামো অনেকটা বিচ্ছিন্ন, প্রকৃত যোগাযোগ তাদের সাথে ততটা নাই। যারাই আমরা আমরাই হলাম মালিক, তোমরা আমাদের গোলাম । তোমরা এসো,আমাদের বাড়ির দরজায় দাড়িয়ে থাকো, আমাদের হুকুম নাও, আমাদের হুকুম মতো চলো, আমাদের হুকুম মতো কাজ করো, এই ছিল মনোভাব।

কোন স্বাধীন দেশে এই মনোভাব চলতে পারে না। তাতে দেশের মঙ্গল হয় না, তাতে দেশের অমঙ্গল টেনে আনা হয়। এটা বিস্তারিত আলোচনা না করলেও আপনারা বুঝতে পারবেন। বক্তৃতা করে বোঝাবার ক্ষমতা আমার নেই । আপনারা বহুদিন যাবৎ এই প্রশাসন যন্ত্রের সাথে জড়িত আছেন এবং বহুদিন যাবৎ রাজনীতি করছেন। সেজন্য আমি আপনাদের বোঝাতে চাইও না। কিন্ত একথা সত্যি, এই চিন্তাধারা আমার ও আমার সহকর্মীদের মনে ছিল যে, এর আমূল পরিবর্তন দরকার । দুনিয়ার অনেক দেশে দেখেছি, কোথাও প্রেসিডেলিয়াল পদ্ধতির সরকার, তাদের এক রকম চলে ।

কোথাও পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার, তাদের এক রকম চলে । কোথাও বা আছে মিক্সড পদ্ধতির সরকার, তাদের অন্য রকম চলে । কিন্তু আমার বাংলাদেশের যে সমস্যা এবং বাংলাদেশের যে অবস্থা, তাতে সম্পূর্ণরূপে ভাড়া করে কোনটা চালানো আমার পক্ষে সম্ভবপর নয়। আমাদের নিজস্ব পদ্ধতি থাকতে হবে। কারণ, আমাদের মানুষকে চিনতে হবে, জানতে হবে । তাদের সাথে মিশতে হবে, তাদের মনোভাব জানতে হবে।

তাদের ইতিহাস এবং অন্য যা কিছু আছে সংস্কার ইত্যাদি অনেক কিছুই এ-দেশের মানুষের আছে- সেসব বিবেচনা করে একটা পন্থা অবলম্বন করা দরকার । যার উদ্দেশ্য হলো এ দেশের মানুষের মঙ্গল করা,-এ দেশের উপর থেকে অত্যাচার, অবিচার ও জুলুম উৎখাত করা । যাতে সহজে ও সরলভাবে মানুষের মধ্যে সোজাসুজি শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পৌছে দেওয়া যায়। আজকে যে সিস্টেমটা করা হয়েছে, সেটা নতুন। পার্লামেন্টের মেম্বাররা বা সংসদ সদস্যরা লোকালি শীসন পরিচালনা করেন, এমন নজীর দুনিয়ার ইতিহাসে নাই। এই পদ্ধতিতে এ্যাপয়েন্টেড গভর্ণর, এ্যাপয়েন্টেড ম্যাজিস্ট্রেট আছেন।

এমনি অনেক কিছুই আমরা এখানে দিয়েছি যা অন্য কোথাও নাই । এটা একটা নতুন এক্সপেরিমেন্ট । এখন দেখা দরকার, এর উপর নির্ভর করে বাংলাদেশের জনগণের কতটা মঙ্গল করতে পারবো এবং যে আদর্শে উদ্ধুদ্ধ হয়ে কাজ করেছি, এর মাধ্যমে তার বাস্তবায়নে কতটা কৃতকার্য হবো । আজ আমরা কি দেখতে পাচ্ছি, সেটা পরিস্কার করে বলা যাক। আজ ৬১টি জেলা করা হলো। এর কারণ আছে। বাংলাদেশের কমিউনিকেশন সিস্টেম অত্যন্ত খারাপ। বোধহয় দুনিয়ার আর কোথাও এতো খারাপ ২৩৯

সিস্টেম নাই। একজন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্টেটের পক্ষে ৩৫ লাখ, ৪০ লাখ, ৫০ লাখ, ৬০ লাখ লোকের উপর বসে থেকে সুচারুরূপে শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। চেষ্টা করলেও তা হয় না। দুনিয়ার অনেক দেশের লোকসংখ্যা ১ লাখ থেকে ১০ লাখ, ২০ লাখ বা ২৫ লাখ। আমাদের এমন নতুন ডিস্টিক্টও আছে, যার লোক সংখ্যা তাদের চেয়ে অনেক বেশী । ময়মনসিংহ সদর নামে যে ডিস্টিক্ট করেছি, তার লোকসংখ্যা ৩০ লাখের কম নয়।

কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর, নেত্রকোনা, চাদপুর এবং এমনি আরো অনেক জেলায় ১৫ লাখ, ২০ লাখ, ২৫ লাখ পর্যন্ত লোকসংখ্যা রয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্টেটদের তেমন সুযোগ কোথায় যে, ৪০ লাখ, ৫০ লাখ, ৬০ লাখ লোকের একটা প্রশাসন একটা জেলায় বসে সুপারভাইস করবেন? কেমন করে দেখবেন, কোন ইউনিয়নের মধ্যে কি হচ্ছে? কিসের মধ্যে কি হচ্ছে। আরো কটি ডিস্ট্রিক্ট আছে। অনেক সময় দেখা যায়, আমাদের সরকারি কর্মচারীদের যখন বদলি করে দেওয়া হয়, তখন তারা ডিস্টিক্টে যান ও থাকেন। তারপর আবার যখন দরকার পড়ে, তারা চলে আসেন ।

 

২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

তাদের পছন্দ হোক বা না হোক। ভালো কাজ করলে সুনাম নিয়ে চলে আসেন আর খারাপ কাজ করলেও সোজা চলে আসেন। কারণ, ভবিষ্যতে তাদের আর সেখানে যাবার প্রয়োজন নাই। সেজন্য আজ একটা বিরাট কিছু চিন্তা করতে হবে। স্থানীয় এম.পি সাহেবদের, রাজনীতিবিদদের আমি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে স্থানীয় গভর্ণর হিসেবে গ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়েছি। তাদের বিশ্বাস করে অনেক বেশি দ্বায়িত্ব দিয়েছি । কারণ, আমরা বুঝি লোকালি নিজেদের মধ্যে দলাদলি থাকে, একজন একজনকে পছন্দ করেন, একজন আর একজনকে পছন্দ করেন না। এছাড়া নিজের পার্টি আগে ছিল।

অন্য দলও । নানা রকম জিনিস আছে। আত্রীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব থাকে, কুটুন্ব-সাক্ষাৎ থাকে। বড় ভীষণ ব্যাপার। যদি আপনারা এ-সমস্ত জিনিসের উর্দে না উঠতে পারেন, তাহলে যে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তার কি অবস্থা হবে, তা বলতে, তা ভাবতে আমার ভয় হয় । আপনাদের স্বজনপ্রীতির উধ্র্বে উঠতে হবে । গভর্ণরশীপের যে ক্ষমতা আমরা আইনে দিয়েছি, তা কম নয়। আমরা সোজাসুজি কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে জেলার কানেকশন রাখতে চাই।

তেমনি সরাসরি জেলার সাথে থানার, থানার সাথ ইউনিয়নের কানেকশন রাখতে হবে। এখন আপনারা চিন্তা করে দেখুন। যে ক্ষমতা আইনে গভর্ণরদের দেওয়া হয়েছে, তা আগে একজন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটও ভোগ করে নাই। তারচেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতা আপনাদের দেয়া হয়েছে। আপনাদের যে দায়িতৃ দেয়া হয়েছে, তার সাথে সাথে কাউন্সিল করে দেয়া হয়েছে । সেখানে পার্টি থাকবে । পার্টির যিনি সেক্রেটারি থাকবেন, আপনার চেয়ে তার ক্ষমতা কোন অংশে কম থাকবে না। একদিকে আপনি যেমন রেসপনসিবল ফর দ্য এ্যাডমিনিস্ট্রেশন, তেমনি পার্টির যিনি সেক্রেটারি থাকবেন তিনিও রেসপনসিবল সমস্ত পার্টির জন্য ।

যখন গভর্ণর সাহেব কাউন্সিল মিটিং কল করবেন, তখন নিশ্চই সেক্রেটারি সেখানে উপস্থিত হবেন। আবার, যখন সেক্রেটারি সাহেব পার্টি মিটিং কল করবেন, তখন গভর্ণর সাহেব তার সামনে গিয়ে বসবেন, এটা ভূললে চলবে না। কিন্তু যে কথা আমি আগে বলেছিলাম । আপনাদের মহা বিপদ | বিশেষ করে, পার্লামেন্টের যেসব মেম্বার বা যে সমস্ত লোকাল গভর্ণর হয়েছেন, তাদের রেসপনসিবিলিটি কতখানি, তা আপনারা ভেবে দেখবেন ।

আমি আমার সাথে বহুদিন রাজনীতি করেছেন, তাদের আমি চিনি এবং তাদের উপর বিশ্বাস আর আস্থা আছে বলেই আমি তাদের গভর্ণর করেছি। কিন্তু বিশ্বাস এবং আস্থা আপনাদেরও রাখার কর্তব্য রয়েছে । আমার বিশ্বাস এবং আস্থা আপনাদের উপর রেখেছি। সেই জন্য আপনাদের গভর্ণর করেছি। পাস করে বাড়ি যাবেন, দেখবেন, শুনবেন। কিন্তু এখানে আপনাদের রেসপনসিবিলিটি দিয়েছি।

কারণ, দেখা যায়, বাংলার জনগণ পার্লামেন্টের মেম্বারদের এই আশায় ভোট দেয় যে, তারা সব কাজ করে দেবেন। কিন্ত আইন পাস ছাড়া তাদের রেসপনসিবিলিটি এমন কিছু নাই। কিন্তু লায়াবিটি তাদের বেশি। তাদের গালাগালি খেতে হয়। কিন্তু শাসন তারা চালাতে পারেন না। সেই জন্য আমি নতুন সিস্টেমে যাচ্ছি। আপনারা রেসপনসিবিলিটি নিন, আইনও পাস করুন। মাঠে ময়দানে কাজ করলে আপনারা সবই বুঝতে পারবেন। এখানে একটি কথা বলবো। আপনাদের কেউ কেউ এমন জেলায় গভর্ণর হয়েছেন, যেখানে আপনাদের নিজেদের বাড়ি-ঘর, নিজেদের আত্রীয়-স্বজন, নিজেদের পার্টি রয়েছে।

তারা সাবধান । তাদের স্বজনপ্রীতির উধের্ব উঠতে হবে- দুর্ণীতির উর্ধ্বে উঠতে হবে, আত্রীয়-স্বজনকে সাহায্য করার উর্ধেব উঠতে হবে, তাদের একটি রিক্ষ আছে। আপনাদের যারা পার্লামেন্ট মেম্বার, সবচেয়ে বড় রিস্ক তাদের। সেটা কি জানেন, যদি আপনারা কৃতকার্য না হতে পারেন, যদি মানুষ আপনাদের ভালো না বাসে, আপনারা মানুষকে যদি খুশি করতে না পারেন- তাহলে অসুবিধায় পড়বেন । পার্লামেন্টের মেম্বাররা আগে ছাড়া পেতে পারতেন । কোন রকমে লুকিয়ে রাখতে পারতেন । কিন্তু এবার সুদ-আসলে দুটোই যাবার সম্ভাবনা আছে। গভর্ণর সাহেবদের ভয় থাকা দরকার ।

আপনাদের চার্জ দেওয়া হয়েছে । আপনারা এবার কর্মস্থলে গিয়ে কাজ করুন। ল এন্ড অর্ডার আপনাদের দেখতে হবে। ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্ক আপনাদের দেখতে হবে। জিনিসপত্র বিদেশ থেকে যা আসে, তার ডিস্ট্রিবিউশন ঠিকমত হচ্ছে কিনা, দেখতে হবে। ওয়ার্কস প্রোগ্রামের টাকা আপনাদের দেখতে হবে। ফ্যামিলি প্ল্যানিং আপনাদের দেখতে হবে। পাবলিসিটি আপনাদের দেখতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধি হচ্ছে কিনা, আপনাদের দেখতে হবে । খাল কাটা হচ্ছে কিনা, আপনাদের দেখতে হবে । ঘুষ খাওয়া বন্ধ হয়েছে কিনা, আপনাদের দেখতে হবে। থানার মধ্যে করাপশন আছে কিনা, আপনাদের দেখতে হবে ।

আপনাদের সাথে থাকবেন ম্যাজিস্ট্রেট । আপনাদের সাথে থাকবেন এস.পি, আপনাদের সাথে থাকবেন জয়েন্ট এস.পি(ক্রাইম)। আপনাদের সাথে থাকবেন সমস্ত অফিসার, – আপনাদের সাথে থাকবেন রাজনৈতিক কর্মীরা । আপনাদের একটি কাউন্সিল হবে । কাউন্সিলকে আপনাদের কনফিডেন্স-এ নিতে হবে । কাউন্সিলকে বাদ দিয়ে নিজে সব সময় ডিক্টেটরশীপ করতে যাবেন না। কাউন্সিল ডেকে তাদের সাথে আলোচনা করে কাজ করতে হবে ।

কিন্তু আজকে মেম্বার সাহেবের একটি বড় ভয়ের ব্যাপার আছে। বাংলাদেশের জনগণ সাংঘাতিক রি-ধ্যাক্ট করে এটা মনে রাখবেন। সারা জীবন সাধনা করবেন, তারপর একটা অন্যায় করবেন, তার ফলেই মুছে যাবেন বাংলাদেশ থেকে । এইটেই বাংলাদেশের নিয়ম। সারা জীবন সাধনা করবেন, তারপর একটা অন্যায় করবেন, তারপর একটা অন্যায় করলে বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের মুছে দেবে। আপনারা যারা যেখানে লোকালি থাকবেন, সেখানে পার্মানেন্টলি থাকতে হবে, কাজ করতে হবে, আযাডমিনিন্ট্রেশন চালাতে হবে।

দেখতে হবে, যে নতুন জিনিস আমরা করতে যাচ্ছি, তাতে আমরা সাকসেসফুল হতে পারি কিনা । বাংলাদেশ একটি ছোট দেশ। এ বিজ বিটুইন দ্য সাবকন্টিনেন্ট এন্ড সাউথইস্ট এশিয়া । অন্যান্য দেশ যতো বড়ই হোক না কেন, ভবিষ্যতে তারা আমাদের ফলো করবে, যদি আমাদের সিস্টেম সাকসেসফুল হয়। এটা মনে রাখা দরকার । আর তা যদি না হয়, ইতিহাস থেকে আপনারা মুছে যাবেন। আমাদের উদ্দেশ্য কি? কেন আপনারা রিস্ক নিয়েছিলেন? কেন স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিলেন। যাদের আজ আমি গভর্ণর করেছি, তারাআমার সাথে একত্রে কাজ করেছেন।

তাদের মনে রাখা দরকার যে ২৫/২৬ বৎসর আমার সাথে কাজ করেছেন। আপনারা বিন্রে করেননি, বেঈমানি করেননি । আপনারা আমাকে ছেড়ে সরকারি দলে যোগদান করেননি । আপনারা যুদ্ধের সময় শক্রর মোকাবিলা করেছেন। তারা আপনাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে । আপনারা সংসার ছেড়ে দিয়েছিলেন, আপনারা সবকিছু করেছেন। কেন করেছিলেন? নিজের জন্যঃ তা নয়। এ দেশের গরিব দুঃখীদের জন্য । যাতে একটা শৌষণমুক্ত সমাজ করতে পারেন- সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি করতে পারেন। যাতে বাংলার মানুষ সুখী হয়, ধলার মানুষ অত্যাচার-অবিচার থেকে বাচতে পারেন।

 

২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

সেখানে যদি মানুষের উপর অত্যাচার না হয়, অবিচার না হয়, ঘুষ-দূর্ণীতি করতে পারেন, তাহলে আমাদের কাজের সুবিধা হবে। শুধু সরকারি অর্থে জনগণের মঙ্গল হয় না, উন্নতির কাজ হয় না। জনগণকে একতাবদ্ধ করতে হবে। আপনাদের জনগণকে মবিলাইজ করতে হবে। সেজন্য জনগণের মধ্যে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করতে হবে। সেই অনুপ্রেরণা সৃষ্টির দায়িত্ব থাকবে পার্টির এবং ত্যাডমিনিস্ট্রেশনের, গভর্ণরের, জয়েন্টলি। সরকার যদি দেন ৫০ হাজার টাকা, আপনারা কাজ করাবেন ৫ লাখ টাকার । বাংলার মানুষকে কোন কাজ করতে বললে তারা না বলে না।

বাংলার মানুষ যদি বোঝে যে, এই কাজে তাদের উন্নতি হয়, তবে তারা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়বে । সেজন্য অনেক বেশি। দ্বিতীয়ত, যারা পার্লামেন্টের মেম্বার আগে ছিলেন, এখন নাই, তারাও আমার সাথে কাজ করেছেন। তাদের এবিলিটি সম্বন্ধে আমার যথেষ্ট ধারণা থেকে ভালবাসা না পান, আপনাদের পরিষ্কার কথায় বলতে চাই যে, তারা যদি পপুলারিটি হারিয়ে ফেলেন_ তাহলে অসুবিধায় পড়বেন। আমার কিন্তু সাফ সাফ কথা । আমার কে কি করলো না করলো আমি কিছু শুনবো- টুনবো না। আপনার জায়গার মানুষ আপনাকে ভালবাসে কিনা, আমি সেটা দেখবো ।

যদি আপনার বিরুদ্ধে সেখানে গণবিক্ষোভ হয়, বাংলার জনগণ যদি দেখে যে আপনি ভাল কাজ করেছেন না, যদি আপনার সম্বন্ধে নেপোটিজম, করাপশনের অভিযোগ দেখা যায়, আমি কিছু শুনবো-টুনবো না। আপনাদের তো ধারণা আছে যে, আমি কোন কিছুতে হাত দিলে কিন্ত হাত উঠাই না। ওটা আমার নিয়ম নয়। হাত দেওয়ার আগে আমি বহুবার চিন্তা করি। কিন্ত একবার যদি হাত দিয়ে বসি- মাথা চলে যেতে পারে কিন্তু সে হাত আমার কমই উঠে। আমি আপনাদের যে নতুন সিস্টেম. দিয়েছি, এর মধ্যে আপনারা বেঁচে থাকবেন, আমিও বেঁচে থাকবো, বাংলাদেশ দুনিয়াতে বেঁচে থাকবে ।

অনেক অনুন্নত দেশ আপনাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেবে- এখানে কি ব্যাপার হয়েছে। অত্যাচার-অবিচার আপনাদের এরিয়ার মধ্যে যাতে না হয়, তার জন্য আপনারা সেখানে ড্রাসটিক্যালি শাসন চালাবেন। ভাল করে কাজ আছেন আপনাদের সাহায্যের জন্য । যদি দরকার হয়, তাদের ডাকবেন। তারা বসবেন। বলবেন, আপনাদের সাহায্য করবেন। যদি দরকার হয়, আমার কাছে চলে আসবেন।

গণভবনে সোজাসুজি টেলিফোন থাকবে, আমার অফিসে থাকবে একটা । আপনারা যদি দেখেন যে, কোন জায়গায় কোন ডিপার্টমেন্ট আপনাদের সাথে কো-অপারেট করছে না, সোজাসুজি টেলিফোন করবেন। সেল থাকবে, অফিসার বসে থাকবেন, সিনিয়র অফিসার । খবর দিলে দেখবেন যে, সাথে সাথে কাজ শুরু হয়ে গেছে। এই ব্যবস্থা আমি আপনাদের জন্য করছি। আর একটা কথা । পার্টির সদস্য ছাড়া অন্য কেউ গভর্ণর হতে পারেন না এবং এখন পর্যন্ত খুব কম মানুষই পার্টির সদস্য পদ পেয়েছেন ।

যাদের আমি আজকে গভর্ণর করেছি, তাদের পার্টির মেম্বারশীপ দিয়ে এখানে আসতে, বসতে দেওয়া হয়েছে। তা না হলে তারা এখানে বসতে পারেন না। যেসব সরকারি কর্মচারী ভাইদের গভর্ণর করেছি, তাদের বেলায় এমনি কর্মচারীদের-যারা আমার চোখে ভালো । তারা সিনিয়র হন বা জুনিয়র হন, তাতে কিছু আসে যায় না। তাদের আমি গভর্ণর করেছি। পূর্ণ রেসপন্সসিবিলিটি তারা নিচ্ছেন। মনে রাখতে হবে- সরকারী কর্মচারীদের মধ্য থেকে যারা গভর্ণর হয়েছেন, তারা প্রিসাইডও করবেন।

পার্লামেন্টের মেম্বাও সেখানে বসবেন। তাহলে এই গভর্ণরদের পজিশন কোথায় উঠে গেল, সে কথা একবার চিন্তা করে দেখুন। দ্বিতীয়ত. যেখানে পার্টি কল করবে সেখানে গভর্ণরকে যেতে হবে, সেখানে বসতে হবে, আলোচনা করতে হবে। আপনারা এখন থেকে আর সরকারি কর্মচারী নন, পলিটিক্যাল পার্টি ওয়ার্কার-রিমেম্বার ইট- বাকশালের সদস্য । যেমন আমাদের পার্লামেন্টের মেম্বাররা বাকশালের সদস্য, তেমনি সরকারি কর্মচারীরাও বাকশালের সদস্য এবং সদস্য হিসেবে তাদের সেই পজিশনে সেখানে যেতে হবে এবং সেখানে কাজ করতে হবে । পার্লামেন্টের মেম্বার থাকবেন এঁ কাউন্সিলের সদস্য ।

আর্মি থেকেও একজনকে দিয়েছি। তাকেও মেম্বারশীপ দিয়ে খুলনায় গভর্ণর করেছি। এই রকম করে আমি সব জায়গা থেকে লোক এনে দেখতে চাই । এটা মনোপলি নয় আর যিনিই ফেল করবেন, চলে যাবেন, রাস্তা থেকে লোক ধরে এনে বসিয়ে দেবো। যিনি ভালো কাজ করবেন, তিনিই প্রশাসন চালাবেন। আর কোন কথা নাই। তবে, এটা একটা নতুন সিস্টেম। আর নতুন সিস্টেমে বাধা আছে। নতুন সিস্টেমের মধ্যে একটা ভয়ের সঞ্চার হয়। নতুন কিছু করতে গেলে একটা আশঙ্কা আসে । মানুষের মধ্যে দ্বিধা- সংশয় দেখা যায়। কিন্তু গত বিশ-পঁচিশ বছর আমি দেখেছি, ইংরেজ আমলের সিস্টেম- এ দেশে চলতে পারে না।

আজ আমি কেবল গোড়ায় হাত দিয়েছি। এখন ডিস্টিিক্ট করেছি। এক বছরের মধ্যে আমি থানায় যাচ্ছি। থানায় আমি আ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল করছি। থানায় যিনি হেড হবেন, তার নাম হবে থানা প্রশাসক । তিনি এমপি পারেন। সেখানেও হাই অফিসিয়াল থাকবেন। এইভাবে আ্যাডমিনিস্ট্রেশন চলবে। এমনি করে লোকাল প্রোগ্রাম, কালেকশন, সব কাজই চলবে, ভবিষ্যতে আরো অনেক কাজই করতে হতে পারে ।

এই যে আমাদের ডিস্টরিক্গুলো হয়েছে যখন আমরা সেগুলোর অবস্থা জানতে পারবো, তখন প্রোকিয়ারমেন্টের অবস্থা জানতে পারবো, ডিস্ট্রিবিউশনের অবস্থাও জানতে পারবো, তখন সেখানকার ফুল রেসপনসিবিলিটি তাদের নিতে হবে। ভবিষ্যতে সব কিছুর দায়িত্ব নিতে হবে। এ দায়িত্ব গভর্ণর সাহেবদের এবং আপনাদের কাউন্সিলের । যদি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হয়, সমস্ত দায়িত্ব হবে আপনাদের । যদি ফুড সিচুয়েশন খারাপ হয়, পুরো দায়িত্ব আপনাদের ।

 

২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
২১ জুলাই ১৯৭৫ ১ম সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

যদি সেখানে দুর্ণীতি হয়, তা দমনের কর্তব্য আপনাদের । যদি সেখানে টেস্ট রিলিফের টাকা চুরি হয়, তাহলে তা বন্ধ করার ভারও আপনাদের । যদি ওয়ার্কস প্রোগ্রামের টাকা চুরি হয় তবে জনসাধারণের কাছে আপনাদেরই জবাব দিতে হবে। দেখুন কোথায় আছি আমরা। ফারটিলাইজার বাজারে বিক্রি হয় না। ফারটিলাইজার আমার সরকার থেকে দিই কিন্তু কোন বাজারে ফারটিলাইজার পাওয়া যায় না। আমাকে বুঝিয়ে বলুন, কোথা থেকে বাজারে যায়। গভর্ণমেন্ট গোডাউন থেকে যায়। আমরা গম আনি, গম বাজারে বিক্রি হয়। আমি ওয়ার্কস প্রোগ্রামে গম দিই, ফুড ফর ওয়ার্কে দিই।

এজন্য গমের ব্যাপার আমরা কিছু জাস্টিফাই করতে পারি। কিন্ত ফারটিলাইজারের ব্যাপারে জাস্টিফাই করি কি করে? আজকে সবদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রত্যেক ডিস্ট্রিক্ট যে টাকা যাবে, প্রত্যেক গভর্ণরকেই একটা রুমে তার চার্ট টাঙিয়ে রাখতে হবে বড় করে। পাবলিক যাতে দেখতে পারে । আমার টেস্ট রিলিফের টাকা আসছে, এই প্রোজেক্টে এইখানে খরচ হচ্ছে। এই ওয়ার্কস প্রোগ্রামে আসছে এখানে খরচ হচ্ছে । এই ফারটিলাইজার আসছে, এই জায়গায় গেল, অমুক ইউনিয়নের গেল। সব কিছুরই চার্ট টাঙিয়ে দিতে হবে। ডিস্ট্রিক্ট লোকদের জানাতে হবে।

সরকারের জিনিসপত্র কোন দিক দিয়ে আসে, কোন দিক দিয়ে যায়, কেউ জানে না। কত ফুড গেল ডিস্ট্রিক্ট, তা জানতে হবে। কোন থানায় কত গিয়েছে, কোন ইউনিয়নে কত গিয়েছে, তাও জানাতে হবে। এখন সমস্ত জাতিকে মবিলাইজ করতে হবে। তা না করতে পারলে কোন কাজ হবে না। আজ দায়িত্ব অত্যন্ত বেশি। আপনাদের যে টেকনিক্যাল ট্রেনিং আছে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে। বক্তৃতা করলে চলবে না। এখানে ত্যাডমিনিস্ট্রেশন করতে হবে । বুঝছেন, শিখতে হবে। শুধু অর্ডার দিলে হবে না। শুধু এটা করো, ওটা করো, এমন করলে হবে না। দেশে আইন-কানুন আছে।

আইন-কানুনের মধ্যে আপনারা বেআইনী কোন কাজ করবেন না। দেশের আইনের মধ্যে থাকতে হবে, তার মধ্যে অর্ডার করতে হবে। এই আইনগুলো পার্লামেন্টের শুধু একথা বললে হবে না। আপনাদের দেখে নিতে হবে, এই আইন এবং এই আপনাদের আ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ক্ষমতা । আপনাদের সাথে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন । তাদের এক্সপিরিয়েনস আছে। তারা ত্যাডমিনিস্ট্রেশন পরিচালনা করেছেন। তারা এ সমস্ত আইন-কানুন খুটিনাটি জানেন। আর, মনে রাখবেন, মিনিস্টার সাহেবরা আছেন, তারা অর্ডার করেন।

কিন্তু অর্ডার ইস্যু হয় সেক্রেটারির নামে, সেকশন অফিসারের নামে । এসব ভুলে গেলে চলবে না। আমরা অর্ডার করি, ডু দিস। সেটা এ জায়গায় ফাইলেই থাকে। এখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে সেক্রেটারী, জয়েন্ট সেক্রেটারী, ডেপুটি সেক্রেটারী, সেকশন অফিসার থেকে সমস্ত ডিপার্টমেন্টে ইস্যু হয়ে যায়। তেমনি করেই আপনারাও বলবেন। আপনাদের ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের যারা সেক্রেটারি, ডিস্টিক্ট ম্যাজিক্ট্রে, তাদের নামে ইস্যু হবে। আপনাদের অর্ডার আপনাদের ফাইলেই থাকবে । এই নিয়ম আছে।

আপনাদের কতকগুলো প্রটোকল মানতে হবে। সব কিছু আপনাদের হাতে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিদেশী লোক গেলে আপনারা কি করে . প্রটোকল করবেন? আপনাদের ফরেন পলিসি সম্বন্ধে ধারণা থাকা দরকার । আপনাদের রাষ্ট্রের কাঠামো সম্বন্ধে ধারণা থাকা দরকার, গ্যাডমিনিস্ট্রেশন সন্বন্বেও ধারণা থাকা দরকার । আর, বিচার ব্যবস্থা তাড়াতাড়ি বদলে ফেলা দরকার । বিচারের নামে অবিচার আর চলে না। এবার নতুন একটা কাঠামো করুন। সোজাসুজি বিচার হয়ে যাক। যাওয়ার সময়.একজন জামাইয়ের কাছে ব্রিফ দিয়ে যান, তার মরবার আগে পর্যন্ত মামলা চলতে থাকে ।

সাহেবরা এবার থানায় যান। থানায় গিয়ে ওকালতি করুন। আমার আপত্তি নাই- সব থানায় নিয়ে যান। থানায় মানুষ অতি সহজে নৌকা ভাড়া করে, পায়ে হেটে এসে বিচার পাবে। ডিস্ট্রিক্টে এসে, মানে সদরে এসে, বাংলার দুঃখী মানুষ কোন দিন বিচার পায় নাই। দেখুন গিয়ে, লোকে জেলের মধ্যে ফিফটি ফোর-এর আসামী হয়ে ছয় মাস, এক বছর পড়ে থাকে, কিন্তু তার পনের দিন জেল হয়। জীবনভর আমি জেল খেটেছি, কয়েদিদের সাথে জীবন কাটিয়েছি।

 

 

Bangabandhu Gurukul

Bangabandhu Gurukul

আরও পরুন :

মন্তব্য করুন