২১ জুলাই ১৯৭৫ ২য় সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

২১ জুলাই ১৯৭৫ ২য় সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণঃ আমি জানি তাদের কি দুঃখ, কি কষ্ট। বিচার হোক, জেল খাটুক। কিন্তু বিচার হয় না, হাজতে থাকে । ফিফটি ফোর এর এক বছর দুবছর হাজত খেটে এক মাস জেল হয়। আর এই যে এক বছর এগার মাস গেল, তার ক্ষতিপূরণটা কে দেয়। আবার অনেক সময় খালাসও হয়ে যায়। আমি এগুলোকে থানা লেভেলে নিয়ে যেতে চাই। পয়সাকড়ি আমাদের অভাব আছে, বুঝি আযাড মিনিস্ট্রেশন পয়সা কিছু কম খরচ করতে হবে। এখন, অনেকে আমাকে বলেন, আমাদের অফিস কোথায় হবে ।

 

২১ জুলাই ১৯৭৫ ২য় সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
২১ জুলাই ১৯৭৫ ২য় সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

২১ জুলাই ১৯৭৫ ২য় সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

গভর্ণর সাহেবরা আপনাদের নিজের নিজের এরিয়ার মধ্যে বাড়ি আছে। যারা সরকারি কর্মচারী আছেন, তাদের একটু হেল্প করবো আর আপনাদের বাড়িঘর ওখান থেকে যোগার করে নিতে হবে। মনে রাখবেন, আমরা দেবো, কিন্তু কিছু বাড়িঘর করে দেবো । কিন্তু নিজেদেরও যোগাড় করে নিতে হবে । আর যদি দরকার হয়, নিজে কুড়েঘরে থাকবেন। গ্রামে যান। আর এ ডাকবাংলো করবেন না। আগে ডাকবাংলো করা হতো, এখন তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছ। অবশ্য ডাকবাংলা উপকারে লাগে ।

কিন্তু এর মেইনটেন্স খরচ অনেক বেশি । আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি । যাই হোক, আগে যান । যেখানে যাবেন, সেখানে কিছু কিছু টিনের শেড করুন। টাকা কিছু কিছু আমরা রেখেছি দেওয়ার জন্য । টিনের শেড করে অফিসারদের জন্য কিছু বাড়ি, কিছু থানা, কিছু জেলখানা করতে হবে।

এগুলো আমরা করে দিচ্ছি, যত তাড়াতাড়ি হয় এবং সেটাও আপনাদেরই উপর চার্জ দিচ্ছি। রিমেম্বার, টাকা ভাগ করে স্কিম করে, সব দিয়ে দেয়া হবে। গভর্ণর সাহেবরা, আপনারা টেন্ডার কল করে তাড়াতাড়ি করে ঘর উঠিয়ে ফেলুন। অনলি ইঞ্জিনিয়ার যাবেন। যদি দরকার হয়, পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ার থাকবেন, হাই ওয়েজের ইঞ্জিনিয়ার থাকবেন। ইঞ্জিনিয়ার সাহেবরা, গভর্ণর এবং ডিস্টটিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, এই পাঁচজনকে দিয়ে আমরা কমিটি করে দেবো এবং টাকা তাদের হাতে দেবো । সেই টাকা আমরা তাদের কাছে দিয়ে, তাদের স্থবিম করে দেবো । সেই টাকা দিয়ে কাটছাট করে কিছু অফিস, কিছু টিনশেড ঘর-বাড়ি তাড়াতাড়ি করে নিতে হবে।

যেখানে যা কিছু পাওয়া যায়, ভাগ করে থাকবেন। এক কামরা, দু’কামরা যা পাওয়া যায়, তাতে থাকবেন। এ-দেশের মানুষ না খেয়ে মারা যায়। এখানে অত ফ্যাশনের কি দরকার! আপনারা ঠিকভাবে কাজ করুন। অন্যান্য বিষয়ের ব্যবস্থা করবার জন্য আমি সমস্ত মিনিস্টার সাহেবদের অনুরোধ করেছি। ভাইস-প্রেসিডেন্ট সাহেবদের অনুরোধ করেছি। পলযানিংয়ের ব্যাপারে । প্রাইম মিনিস্টার সাহেবকেও অনুরোধ করেছি। তিনিও বলবেন।

আর এই যে- আমি আপনাদের জন্য ম্যাপ করে এনেছি। দেখেছেন? অলরেডি ম্যাপ করা হয়ে গেছে। বুঝতেই পারছেন, এক একটা এরিয়ায় বা পপুলেশন তাতে দেখা যায় যে, অনেক দেশ-অনেকে বলতে পারেন, যারা খবর রাখেন, তারা বলতে পারেন যে, ২০ লাখ, ৩০ লাখ লোকের দেশ, শ খানেক দুনিয়ায় হবেই। আমাদেরও ১০ লাখ, ২০ লাখ, ৩০ লাখ লোকের দেশ, আপনারা এক-একজন তার বাদশার মতো । অফ কোর্স ইউ আর নট বাদশাহ, আপনারা খাদেম ।

সমস্ত জেলা ভাগ করে দেয়া হয়েছে। শুধু একটার মধ্যে আমাকে চেঞ্জ করতে হবে। বান্দরবান এরিয়ার একটা থানা কক্সবাজারে নিয়ে যেতে হবে । আর সব দেখে ম্যাপ করা হয়েছে। এ্যডজাষ্টম্যান্ট, রি-এ্যডজাষ্টমেন্ট করতে হবে। তার জন্য কমিটি করে দেয়া হয়েছে। সেখানে দেখবেন, কোথায় কি আাডজাস্টমেন্ট রি-আযাডজাস্টমেন্টের দরকার হয় । এখন আমি সরকারি কর্মচারীদের আর একটি কথা বলবো।

যদিও আপনারা সরকারি কর্মচারী, আপনারা গভর্ণর হয়েছেন। সেখানে পার্লামেন্টের মেম্বার থাকবেন। সকলে মিলেমিশে কাজ করতে হবে । এখন থেকে সবাই গভর্ণমেন্টের চাকরি করবেন, সাথে সাথে পার্টি মেম্বারও থাকবেন। পার্টি মেম্বার ক্লোজ, গভর্ণর শীপ ক্লোজ, এভরিথিং ক্লোজ। বুঝতে পারছেন ব্যাপারটা । সব কাধের উপর চাপিয়ে দেবো । যাতে খালি বক্তৃতা না করেন, এরপর থানায় থানায় দেবো । বলবো কাজ করুন।

ফেল করলেন-ব্যস খতম । আমি গিয়ে বক্তৃতা করে আসবো, উনি কাজ করতে পারেন না, ওকে বিদায় করে দাও । লোকে তাই করে দেবে। হ্যা, এইভাবে কাজ করতে হবে। মোট কথা, এই শাসন ব্যবস্থা হয়েছে জনগণের মঙ্গলের জন্য । জনগণ যাতে সোজাসুজি শাসন ব্যবস্থার ফল ভোগ করতে পারে, তার জন্যই এই সিস্টেম করা হয়েছে । সোজা কথায়, কোনরকম অসুবিধা যেন তাদের ভোগ করতে না হয়।

সব কিছুই যেন জনগণের সামনে নিয়ে যাওয়া হয় ইডেন বিল্ডিংস বা গণভবনের মধ্যে । আমি শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা রাখতে চাই না। আমি আস্তে আস্তে, গ্রামে, থানায়, ইউনিয়নে, জেলা পর্যায়ে এটা পৌছে দিতে চাই। যাতে জনগণ সরাসরি এসবের সুযোগ-সুবিধা পায় । বড় জিনিস হলো, একটা লাস্ট কথা, যেটা আমি বার বার বলি- করাপশন। আমি আমার সহকর্মীদের ভেতর থেকে যাদের দিচ্ছি এবং এ পর্যন্ত আমি গভর্ণর করেছি, তাদের প্রতি- সরকারি কর্মচারী থেকে আর্ত করে, সকলের প্রতি আমার আস্থা আছে। আমি বিশ্বাস করি যে, তারা করাপশনের উধ্র্বে থাকবেন। কিন্তু শুধু নিজেরা ঘৃষ খাওয়াই করাপশন নয় ।

এ সম্বন্ধে আমার কথা হলো করাপ্ট পিপলকে সাহায্য করাও করাপশন। নেপোটিজমও কিন্তু এ টাইপ অফ করাপশন। স্বজনগ্রীতিও কিন্তু করাপশন। আপনারা এসব বন্ধ করেন। কোন ভয় নাই, কোন ভয় নাই। কারো ভয় নাই। আল্লাহ ছাড়া কারো ভয় করবেন না। আমিও আপনাদের সাথেই আছি। 04 স্বজনগ্রীতি ছেড়ে দিলে আপনারা করাপশন বন্ধ করতে পারবেন । যারা থানা এ্যাডমিনিস্ট্েশনে রয়েছেন, তারা সেখানে করাপশণ বন্ধ করবেন। সেখানে অনেক জিনিসের ডিস্ট্রিবিউশন হয়, সব কিছুর ডিস্ট্রিবিউশন হয় থানা লেভেলে, ডিস্ট্রিক্ট লেভেলে ।

এসব জায়গায় যদি করাপশন বন্ধ করতে পারেন, তাহলে উপরের করাপশন অটোমেটিক্যালি বন্ধ হয়ে যাবে। এটার উপর সোজা নজর দেবেন। প্রত্যেকে নজর দেবেন । আর, আজ আমার কাছে আপনারা তওবা করে যান যে, স্বজনগ্রীতি করবেন না। ঘুষখোরদের সাহায্য করবেন না। মাত্র কয়েকটা লোকের জন্যই বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ দূর করা যায় না- আমি এর প্রতিকার দেখতে চাই। এর জন্য আপনাদের কাছে অনুরোধ রইলো। আর, আমার কর্মী যারা আছেন, যারা আমার কথায় বন্দুক ধরে যুদ্ধ করেছিলেন, যারা আমার কথায় মাতৃভূমি ত্যাগ করে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

 

২১ জুলাই ১৯৭৫ ২য় সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
২১ জুলাই ১৯৭৫ ২য় সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

যারা আমার কথায় সব কিছু ত্যাগ করতে পারতেন, তারা আমার একটা কথা রাখুন_ঘুষ দুর্নীতি বন্ধ করুন, আপনাদের এরিয়াতে যেয়ে দেখুন, বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ দূর হয় কিনা । তারা না খেলেও কথা বলবে না। যদি তারা দেখে যে, তাদের সামনের খাবার অন্যে না খায়। যদি তাদের বোঝানো যায় যে, না আমার নাই, তাহলে তারা দুঃখ করবে না। তারা যখন দেখে যে, তাদের জন্য যে আটা পাঠানো হচ্ছে, তা অন্যে চুরি করে খায়, তাহলে তাদের দুঃখের জায়গা থাকে না। তখন তারা অভিশাপ দেয়। সে অভিশাপ আপনাদের লাগে কিনা জানি না। কিন্তু আমার লাগে। কারণ, তারা আমায় দোয়া করেছে।

এ দেশের মা-বোনেরা যদি আমার জন্য রোজা না রাখতো, মসজিদে মন্দিরে যদি দোয়া না করতো, তাহলে বোধহয় আমি ফিরে নাও আসতে পারতাম । লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ রোজা রেখেছে আমার জন্য মাসের পর মাস। মাঝে মাঝে আমার অসহ্য লাগে, যখন ভাবি, কেন এই করাপশন সমাজের মধ্যে ঢুকেছে? এখন অনেকে এগিয়ে আসছে । আপনারা ইচ্ছা করলে নিজের নিজের এরিয়ার মধ্যে করাপশন বন্ধ করতে পারেন । আমি বিশ্বাস করি, আপনারা পারবেন। অন্য কাজ করুন বা না করুন- এটা করবেন । দূর্ণীতি যেন আর না থাকে । আর একটা কথা আমি আজ আপনাদের বলে দিতে চাই।

থানায় এসে যেন মানুষ বসতে পারে, তাদের যেন পয়সা দিতে না হয়। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে এলে তাদের যেন পয়সা দিতে না হয়। সিও অফিসে যেন পয়সা দিতে না হয়। কোর্টে এলে যেন পয়সা না দিতে হয় এবং তাদের যেন হয়রানি না হয়। যিনি যেখানে থাকবেন, সেখানকার পুলিশ তার আন্ডারে থাকবে । যে রক্ষীবাহিনী সেখানে থাকবে, তা তার আন্ডারে থাকবে । এমনকি, যে আর্মি সেখানে পোস্টিং আছে, সেই আর্মি তার আন্ডারে থাকবে- এ মুহুর্তে এ জায়গায় । অফ কোর্স, তাদের নিজ নিজ কমান্ড আছে। কিন্তু আপনারা যা বলবেন, তা তাদের শুনতে হবে।

আপনাদের কর্তব্য আছে অনেক। করাপশন বন্ধ করুন, আল্লাহর দোহাই, করাপশন বন্ধ করবার চেষ্টা করুন। আপনাদের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে । আপনারা পারবেন । আপনারা লোকালি ঘুরতে থাকুন। আপনারা নৌকায় ঘুরুন, গাড়ি নিয়ে ঘুরুন- মানুষ যাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারে । যে থানায় চুরি-ডাকাতি কমবে না, সেখানকার লোক ডেকে কনফারেন্স করে বলুন- চুরি ডাকাতি তোমাদের এরিয়ার বন্ধ করতে না পারলে তোমরা বিদায় হবে। সাফ সাফ কথা । রেসপনসিবিলিটি নিতে হবে । তোমরা যারা এখানে আছো, তাদেরই এসব বন্ধ করতে হবে।

চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, দুর্ণীতি বন্ধ করতে হবে- এটা ভালো করে জানবেন। সাবধান, আপনাদের সবাইকে আমি এসব বলে রাখছি এখানে । যারা এখানে আছেন, তাদের সবাইকে সাবধান করে রাখছি। আমি এ ব্যাপারে সেন্টিমেন্টাল হয়ে পড়েছি। ভাবছি, কি করে এগুলো দূর করা যাবে। আমি একটা কাজের কথা বলি- দুই বছর আগে, আর এক বছর পরে তাতে হাত দিই । রিমেম্বার ইট । আপনারা জানেন, আমাকে ভালো করেই জানেন। আপনাদের কাছে আমার কথা রইল, যাদের আমি গভর্ণর করেছি- তারা করাপশন বন্ধ করুন। ৃ ৃ ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্ক, ফ্যামিলি প্ল্যানিং আর আমার দ্বিতীয় বিপ্লবের যে চারটি প্রোগ্রাম আছে- সেগুলো আপনারা করুন।

ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কের জন্য পাম্প পেলাম না, এটা পেলাম না- এসব বলে না থেকে জনগণকে মবিলাইজ করুন। যেখানে খাল কাটলে পানি হবে, সেখানে সেচের পানি দিন। সেই পানি দিয়ে ফসল ফলান। মবিলাইজ দি পিপল। পাম্প যদি পাওয়া যায়, ভালো। যদি না পাওয়া যায়, করে স্বনির্ভর হন। বাধ বেধে পানি আটকান, সেই পানি দিয়ে ফসল ফলান। আমাদের দেশে কি পাম্প ছিল? দরকার হয়, কুয়া কেটে পানি আনুন। আমাদের দেশে পাচ হাত সাত হাত, আট হাত কুয়া কাটলেই পানি উঠে ।

সেখানে অসুবিধা কি আছে? যে দেশে পানি আটকে রাখলে পানি থাকে, সেখানে ফসল করবার জন্য চিন্তার কি আছে? আর, এখন থেকে যে সমস্ত সার থানায় যাবে, তা যেন রেগুলারলি গরিব-দুঃখীরা পায়। আর একটি কথা । মাথা যেন গরম না থাকে। সাবধান, মাথা গরম করে শাসন করা যায় না। মাথা গরম না করে কাজ করতে হবে। আর সংযম ও সহনশীলতা যেন থাকে । সংযম ও সহনশীলতা না থাকলে কোন কিছুই করতে পারবেন না এবং যে কোন ডিসিশন নিতে চিন্তা-ভাবনা করে, পরামর্শ করে করবেন। যেটা ভালো মনে করবেন, সেটা করবেন।

চিন্তা ভাবনা করে। হঠাৎ কিছু করবেন না। হঠাৎ করলে কিন্তু মানুষের ভুল হয়। চিন্তা-ভাবনা করে ডিসিশন নিয়ে যদি মনে করেন- এটা ভালো, তাহলে স্টিক করবেন। স্কুল-কলেজ আছে, সেখানে গভর্ণমেন্ট টাকা দেয়। প্রাইমারী স্কুলে আমরা টাকা-দিয়েছি। অনেকে স্কুল করে না, অনেকে পড়ায় না, স্কুলেও যায় না। সেখানে লোকে গরু-ছাগল বেঁধে রাখে । টাকাও পায়, আবার রেশনও দিই- সেগুলো ওয়াচ করবেন। আপনি না পারেন, আপনার একজন অফিসার পাঠিয়ে দেবেন।

ডিস্ট্রিক্ট অফিসার, স্কুল অফিসার, এই সমস্তকে কক্ট্রোলে নিয়ে আসুন। এ সম্বন্ধে খোজ নিয়ে আসুন । যদি দেখেন কোন টিচার কাজ করছেন না, তাকে বদলি করে দিন। তারা সরকারি কর্মচারী এখন। টাকা যা পাঠানো হয়, খেয়ে ফেলেন। সাবধান দুর্ণীতি বন্ধ করতে হবে। যত ডিপার্টমেন্ট আছে, সবগুলোর ব্রাঞ্চ সব ডিস্ট্রিকে থাকবে । ওভারওল রেসপনসিবিলিটি আপনাদের । ইনফরমেশন ডিপাটমেন্ট রয়েছে। বাংলাদেশে এখানে বসে যে কাজ হয়, পাবলিসিটি এই ডিপার্টমেন্ট দেয়।

প্রত্যেক ডিস্ট্রিক্ট, সাব ডিভিশনে এর ব্রাঞ্চ আছ। আল্লাহ্‌র মর্জি সেখানকার লোক কয়েকখানা কাগজ দরজায় লাগিয়ে দিয়ে ঘরের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকেন আর বাকি সব সের দরে বিক্রি করে দেন। তার কাছে খোজ নিতে হবে, কত কাগজ এলো । গ্রামে গ্রামে যান, পাবলিসিটি করুন। আর একটি জিনিস মনে রাখতে হবে। এই নতুন সিস্টেম করলাম কেন? কোন ডিপার্টমেন্ট কাউকে মানতে চাইত না। আমি অমুক, আমি ফুড, আমি এগ্রিকালচার, আমি হেলথ, আমি ফ্যামিলি প্ল্যানিং, আমি এটা, আমি ওটা । এসডিও সাহেব, ডিসি সাহেব যতদূর পারতেন করতেন।

না পারতেন না করতেন। কিন্ত সকলেরই সকল বিষয়ে কর্তব্য আছে। একথা সকলেরই মনে রাখা দরকার | যদি গভর্ণর বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বলেন- এই অফিসারের এই কাজ, তাহলে সেই অফিসারকে সে কাজ করতে হবে । যিনি ফুড ডিপার্টমেন্টের, অফিসার, তাকে সে কাজ করতে হবে । তিনি এগ্রিকালচার ডিপার্টমেন্টের অফিসার হলেও এ-কাজ করতে হবে । আমার কাজ ওটা নয়- এ কথা বললে চলবে না। রাস্তার উপর একটা বাশ পড়ে আছে। সেটা কেউ উঠাবেন না । বলবেন, এ কাজ আমার নয়- এটা রোড এন্ড হাইওয়েজের। হাত দিয়ে কেউ বাশটা তুলবেন না।

এ হয়েছে দেশের গভর্ণমেন্টের সবচেয়ে বড় অসুবিধা। এটা আমার নয়, অমুক ডিপার্টমেন্টের । দ্যাট নুইসেল মাস্ট স্টপ ইন দিস কানট্রি। সকলেরই সকল কাজে রেসপনসিবিলিটি আছে। সবাই বাংলাদেশের নাগরিক, বাংলাদেশ সরকারের চাকরি করে । আপনাদের কর্তব্য, যেখানে অন্যায় বা খারাপ কাজ হয়, সেটা দেখতে হবে । যার কাজ তাকে ডেকে বলুন। কিন্তু খবরই দেয় না কেউ। মাল এখানে সেখানে পড়ে থাকে । তেজগাও এয়ারপোর্টের কাছে মাল পড়ে ছিল। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের কাছে মাল পড়ে ছিল। কিছু মাল পড়েছিল অন্যান্য জায়গায় । এটা কার? এটা আমার নয়, টিএন্ডটির।

 

২১ জুলাই ১৯৭৫ ২য় সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ
২১ জুলাই ১৯৭৫ ২য় সালের বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত জেলা গভর্ণরদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ

 

এটা কার? এটা আমার নয়, সিন্ডবির। আমি বললাম, এসব কথা আমি বুঝি না।” আগামীকালের মধ্যেই সব মাল পরিস্কার করে নেওয়া হোক। এটা ঢাকা শহরে দেখেছি। ডিস্ট্রিক্ট এডমিনিস্ট্রেশকে দেখতে হবে, কোথায় কি আছে, না আছে। আমার ঢাকা মেন্রোপলিটনে বাস করি। আর কয়দিন পর ঢাকা শহর থাকবে কিনা, ভাবার কথা । টিন্ডটির রাস্তা কেটে যায়, গ্যাস রাস্তা কেটে যায়, ওয়াসা রাস্তা কেটে যায়। রাস্তার জান শেষ। প্ল্যান ওয়েতে কাজ হচ্ছে না। আর একটা কথা । “কো-অর্ডিনেশন। ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড নাউ, আপনাদের রেসপনসিবিলিটি আর ক্ষমতা কতখানি ।

আমি চারটি কথা বলেছি সেকেন্ড রেভূল্যুশনের জন্য । আশা করি সকলের মনে আছে। এগুলো সামনে রেখে কাজ করবেন। বক্তৃতা যা করি, মেহেরবানি করে পড় ন, যেগুলো পলিসি বক্তৃতা করেছি। আজ বক্তৃতা করিনি, আজ আপনাদের ট্রেনিংয়ের ভিষণ আলোচনা করছি। আপনাদের ট্রেনিং কোর্সের উপর বললাম আপনারা কি কি শিখে যাবেন, এর অর্থ কি, উদ্দেশ্য কি, কেন অন্য মিনিস্টার এটা বললেন, এসব বুঝতে হবে। প্ল্যানিং থেকে কাগজপত্র নিতে হবে। দ্বিতীয় কথা, আমাদের একটা ন্যাশনাল প্ল্যানিং আছে। সে সমন্ধে ভাইস প্রেসিডেন্ট কাল বলবেন। ন্যাশনাল প্ল্যানিং একটা হবে ।

কিন্তু লোকালি হ্যাপহ্যাজার্ড ওয়েতে কাজ করা হয়। আগে দেখেছি, ওয়ার্কস প্রোগ্রামে মাটি কাটার দরূণ পানি বন্ধ হবার ফলে জমি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ওটা আমরা বন্ধ করেছি। এখন লোকালি বসে আমাদের প্ল্যান করতে হবে। আপনারা নিজেরা কামড়া-কামড়ি করবেন না। এটা একটি ফ্যাশন হয়ে দীড়িয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট পাচজন বা ছয়জন এমপি আছেন, চারটি থানা আছে। কেউ বলবেন, আমার থানায় এটা হোক, কেউ বলবেন, আমার ওটা হোক- এভাবে কাজ হয় না।

এই প্রোজেক্টটি ভালো, এই বছর হোক, নেক্সট প্রজেক্ট ওই বছর হোক, তার পরের প্রোজেক্টটি অন্য জায়গায় করুন। এই ভাবে আস্তে আস্তে করুন। ভাগ করে করে প্ল্যান নষ্ট করবেন না। এখানে এই জিনিসটা ভালো হবে, এটা করলে এতো হাজার একর জমিতে ফসল ভালো হয়, এই খালটা আমি করবো । এখানে এই রাস্তাটা করলে ভালো হয়। এটা করবো। এখানে এই পুকুরটা খনন করলে ভালো হয়, এটা আমরা করবো । এইভাবে কাজ করতে হবে।

সবাই যখন কনফারেন্সে বসবেন, তখন কেউ বলবেন না যে, আমার থানায় কত দিলেন। আগেই সবাই প্রোজেক্ট নিয়ে আসবেন, কাজ করবেন। তারপর যা দেওয়ার দিবেন। প্রথমে দেখবেন, কোনটাতে মানুষের উপকার বেশী হবে। সেটা আগে করবেন। আজ এখানে হোক, কাল ওখানে হোক। এভাবে করলে পাঁচ বছরে সব জায়গায় হয়ে যাবে। অসুবিধার কিছু নাই। দুটো করে প্রোজেক্ট করুন। মানুষ দেখুক, বুঝুক। এটা ভুললে চলবে না আপনাদের । সেজন্য আপনারা নিজেরা আপনাদের ছোট ছোট প্ল্যান রাখুন, এবং সেই অনুযায়ী কাজ করুন| আপনাদের কাছে ওয়ার্কস প্রোগ্রাম যাবে, টেস্ট রিলিফ যাবে, ফুড ফর ওয়ার্ক যাবে ।

এসবের জন্য প্রোজেক্ট করে রাখবেন । এছাড়া কোন প্রোজেক্ট ভালো হলো, তা দেখবেন- ওয়ার্কসে পাঠিয়ে দেবেন। পাওয়ারের দরকার যেখানে আছে, তার প্ল্যান করে সেটা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। আমি খবর পেলাম, ঠাকুরগীয়ে একটা কোল্ড স্টোরেজ করা হয়েছে। এক বছর আগে সেটা হয়ে গেছে। কিন্তু পাওয়ার নাই। খবর নিয়ে জানলাম, পাওয়ার সেখানে যেতে এক বছর লাগবে । কারণ, খাস্বা নাই। খাম্বা নাকি বিদেশ থেকে আনতে হবে । মিনিস্টার সাহেবকে বললাম, খাস্বা- টাম্বা অমি বুঝি না, বাশ তো আছে। এখানে দীড়াও খাম্বা কাটো, দা লাগাও । দেড় মাস, দুই মাসের মধ্যে কাজ হয়ে যাবে । এটা লাগাও ।

কি করে লাগবে, সেটা আমি বুঝি টুঝি না। দিল, লেগে গেল। কিন্তু আমার কাছে যদি না আসত, এক বছরের আগে খাম্বা পেত না, এটা হত না। খাম্বা আসে কোথেক। পাওয়ার গেল, আলু রাখল । আলু রাখার জায়গা নাই। এই মেন্টালিটি কেন হয়? খাম্বা বাংলাদেশের গাছে গাছে হয়। আমি বাংলাদেশে প্রতিটি থানায় পাওয়ার দিতে চাই । কো-অপারেটিভও আমি প্রতিটি গ্রামে করতে চাই। এটা সোজাসুজি বাঙালি কো-অপারেটিভ। যাকে বলা হয় মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ । কো-অপারেটিভ ডিপার্টমেন্ট আছে, থাক। ওটা চলুক। আমি এটার নাম দিয়েছি স্পেশাল কো-অপারেটিভ। এর জন্য ১০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।

এর জন্য আমার একটা টার্গেট রয়েছে। আপনারা ৬১ জন গভর্ণর যখন চার্জ নিয়ে যাবেন, দুই তিন মাসের মধ্যে জায়গা ঠিক করে, একটা ভিলেইজ ঠিক করে সব ব্যবস্থা করবেন। আমি এখন প্রোগ্রাম করছি । আমি নিজে ঠিক করছি আমার পদ্ধতি । যেটা করে এক একটা ডিস্ট্রিক্টে একটা করে কো-অপারেটিভ করতে হবে। সেটা হবে মাল্টিপারপাস কো- অপারেটিভ।

প্রথমে এরিয়া ভাগ করে নেবেন। এমন জায়গায় নেবেন, যেখানে আমি ইমিডিয়েটলি পাওয়ার দিতে পারি। এ কো-অপারেটিভগুলোকে আমি পাওয়ার দেবো । ধরুন, যদি রাজশাহীতে করি, তাহলে এমন জায়গায় করতে হবে, যেখানে পাওয়ার নিতে পারি। যদি নাটোরে করি, তাহলে এমন জায়গায় করতে হবে যেন সেখানে পাওয়ার নিতে পারি। এভাবে একটা দুটো, তিনটে গ্রাম নিয়ে কো-অপারেটিভ করতে হবে এবং এটা হবে কম্পালসারি কো-অপারেটিভ এতে কোন কিন্তু-টিন্ত নাই।

তারপর সিস্টেম যা হবে, সবাইকে তা বলে দিতে হবে। এটাকে সাকসেসফুল করতে হবে। এটাকে পুরাপুরি সাকসেসফুল করতে হবে_ এটা স্পেশাল কো-অপারেটিভ নামে পুরাপুরি করতে হবে। তারপর আমার সেন্ট্রাল কমিটির মেম্বারদের সুপারভিশনে একটা কো-অপারেটিভ করবো। তারা সেখানে সুপারভাইজ করবেন। একটা করে স্যাম্পল করে আমরা অগ্রসর হবো । ইনশাল্লাহ তারপর আর কোন অসুবিধা হবে না। একবার যদি একটা ডিস্ট্রিক্টে একটা কো-অপারেটিভ এ মানুষ দেখে যে এই দেশের মানুষের এই উপকার হয়েছে, তাহলে আপনাদের আর কষ্ট করতে হবে না।

তারা নিজেরাই এসে বলবে, আমাদের এটা করে দাও, আমাদের করে দাও, আমাদের করে দাও । আর আমাদের আইডিয়া হলো, একটা ট্রেনিং কোর্স, ট্রেনিং সেন্টার করুন। শেখে বই পড়ে ট্রেনিং হয় না। হলেও খুব কম হয়। কেউ করে শেখে, কেউ দেখে শেখে আর কেউ বই পড়ে শেখে । আর সবচেয়ে যে বেশি শেখে-.সে করে শেখে । আপনারা করে শিখবেন। কাজ করে দেখিয়ে দিন, কিভাবে কাজ করতে হয়। বই পড়ে আমাদের একটা ফ্যাশন হয়েছে। ট্রেনিং সেন্টার করুন। কো-অপারেটিভ ট্রেনিং সেন্টার করে সেখানে সবাইকে নিয়ে যান। এক মাস এখানে ট্রেনিং হবে।

সেখানে পেনশন খাইয়ে কি হবে? কি করবেন সেখানে? লেকচার? পাট গাছে ধান হয় না, ধান গাছে পাট হয় না। বাংলাদেশের মানুষ এটা ভালোই বোঝে । তামাকে বৃষ্টি পড়লে তামাক নষ্ট হয়, তাও বোঝে । রবিশস্য কেমন করে হয় তাও বোঝে । আমরা অনেক লোক এখানে আছি। অমাদের কোন জনগণ ধান- আম-পাট বেঁচে, মরিচ-পেয়াজ বেঁচে লেখাপড়া শেখিনি-এই যাদের গভর্ণর করেছি, তাদের মধ্যে কে ধান-পাট বেঁচে, মরিচ পেয়াজ বেচে লেখাপড়া শেখেনননি। আপনাদের প্র্যাকটিক্রাল নলেজ নাই। খালে ডুবে গোসল করেছি আমরা । নদী সাতরে পার হয়েছি। কত কি গ্রামে করেছি। কি জানেন না।

তবে, হ্যা, একটা সিস্টেম শিখাবার জন্য কোর্স আমরা দিচ্ছি। এই জন্য যে এ্যাডমিনিস্ট্রেশন শিখতে হবে আপনাদের কাগজে কলমে । কাজের জন্য আসতে হবে ময়দানে । আপনাদের কাজ করে শিখতে হবে । সেই জন্য আমার কো-অপারেটিভ। যদি কাজ করে শিখতে চান, যদি ভবিষ্যৎ অন্ধকার করতে না চান, তাহলে আমার কো-অপারেটিভ সাকসেসফুল করুন। আপনারা আমার কথা জীবনভর শুনেছেন। আজো শুনুন। দূর্ণীতির উধ্র্বে থেকে দেশের জন্য কাজ করুন। সিস্টেমটাকে আমাদের সাকসেসফুল করতেই হবে ।

আমি অনেক ভালো অফিসার দিয়েছি। যদি দিয়েছি। বিশ্বাস করি, তারা ভালো কাজ করবেন। এ সম্বন্ধে আমার কোন সন্দেহ নাই। এতে কিন্তু একটা কমপিটিশন আছে। এই সিস্টেমে গভর্ণমেন্ট এমপি আছেন, নন-এমপি আছেন। কমপিটিশানও কিন্ত একটা আছে। এমপি আছেন, নন-এমপি আছেন, সরকারি কর্মচারী আছেন, আর্মি অফিসার আছেন, কমপিটিশন ভালো হবে। যাই হোক, তার জন্য একটা কথা মনে রাখতে হবে । সাফ কথা বলে দিলাম, বি কেয়ারফুল। আপনারা কিন্ত সবাই এক।

 

Bangabandhu Gurukul

Bangabandhu Gurukul

 

আরও পরুন :

মন্তব্য করুন