২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ । বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষণ

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘে প্রথম বাংলা বজবন্ধুর এতিহাসিক ভাষণঃ জনাব সভাপতি আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাড়াইয়া আপনাদের সাথে আমি এইজন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগীদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত করিতেছেন। আত্রুনিয়ন্ত্রাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি এতিহাসিক মুহূর্ত । স্বাধীনভাবে বাচার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়ে বাঁচার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাহারা বিশ্বের সকল জাতির সাথে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্খিত ছিলেন।

 

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ । বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষণ
২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘে প্রথম বাংলা বজবন্ধুর এতিহাসিক ভাষণ

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘে প্রথম বাংলা বজবন্ধুর এতিহাসিক ভাষণ

যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন। আমি জানি, শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সকল মানুষের আশা-আকাঙ্কা বাস্তবায়নের উপযোগী একটি বিশ্ব গড়িয়া তোলার জন্য বাঙালি জাতি পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । আমাদের এই অঙ্গীকারের সাথে শহীদানের বিদেহী আত্বাও মিলিত হইবে । ইহা বিশেষ আনন্দের ব্যাপার যে স্বাধীনতাযুদ্ধেও একজন সক্রিয় যোদ্ধা সভাপতি থাকাকালেই বাংলাদেশকে এই পরিষদের অন্তর্ভুক্ত করিয়া নেওয়া হইয়াছে।

নিরপেক্ষ দেশগুলির শীর্ষ সম্মেলনের সাফল্যের ব্যাপারে আপনাদের মূল্যবান অবদানের কথা আমি স্মরণ করিতেছি। যাদের ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ বিশ্ব-সমাজে স্থান লাভ করিয়াছে, এই সুযোগে আমি তাদেরকেও অভিনন্দন জানাই । বাংলাদেশের সং সমর্থনদানকারী সকল দেশ ও জনগণের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংহত করণ, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় বাংলাদেশকে যাহারা মুল্যাবান সাহায্য দিতেছেন তাহাদেরকেও আমরা ধন্যবাদ জানাই। জাতিসংঘে যাহারা আমাদের স্বাগত জানাইয়াছেন, তাদেরকে আমি বাংলাদেশের পক্ষ হইতে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইতেছি।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম হইতেছে সার্বিক অর্থে শান্তি এবং ন্যায়ের সংগ্রাম.আর সেই জন্যই জন্মলগ্ন হইতেই বাংলাদেশ বিশ্বের নিপীড়িত – জনতার পার্থ দাড়াইয়া আসিতেছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পরে এই ২৫ বৎসরের অভিজ্ঞতা হইতে দেখা যায় যে, এইসব নীতিমালার বাস্তবায়নে অব্যাহতভাবে কি তীর সংগ্রাম চালাইয়া যাইতে হইতেছে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার লক্ষ লক্ষ বীর যোদ্ধার চরম আত্বদানের মাধ্যমে শুধুমাত্র জাতিসংঘ সনদ স্বীকৃত আত্বনিয়ন্ত্রণাধিকার পুনরুদ্ধার সম্ভব ।

আগ্রাসনের মাধ্যমে বেআইনীভাবে ভূখন্ড দখল, জনগণের হরণের জন্য . সেনাবাহিনী ব্যবহার এবং জাতিগত বৈষম্য ও বর্ণবৈবম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এখানো অব্যাহত রহিয়াছে! আলজেরিয়া, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ এবং গিনিবিসাউ এই সংঘ্বামে বিরাট বিজয় অর্জন করিয়াছে। চূড়ান্ত বিজয়ে ইতিহাস যে জনগণ ও ন্যায়ের পক্ষেই যায়, এইসব বিজয় এই কথাই প্রমাণ করিয়াছে। কিন্তু বিশ্বের বহু অংশে এখনো অবিচার ও নিগীড়ন চলিতেছে। অবৈধ দখলকৃত ভূখন্ড পুরাপুরি মুক্ত করার জন্য আমাদের আরব ভাইদের সংগ্রাম অব্যাহত রহিয়াছে এবং প্যালেস্টাইনী জনগণের বৈধ জাতীয় অধিকার এখনো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয় নাই।

উপনিবেশ বিলোপ প্রক্রিয়ার যদিও অগ্রগতি হইয়াছে কিন্তু এই প্রক্রিয়া এখনো চুড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছায় নাই, বিশেষ করিয়া আফ্রিকার ক্ষেত্রে এই সত্যটি স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। এই অঞ্চলের জিষাবুয়ে দক্ষিণ রোডেশিয়া এবং নামিবিয়ার জনগণ জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য দৃঢ়তার সাথে লড়াই করিয়া যাইতেছে। বর্ণবৈষম্যবাদ, যাহাকে মানবতার বিরোধী বলিয়া বার বার আখ্যায়িত করা হইয়াছে, তাহা এখানে আমাদের বিবেককে দংশন করা অব্যাহত রাখিয়াছে।

একদিকে অতীতের অন্যায়-অবিচারের অবসান ঘটাইতে হইতেছে, অপরদিকে আমরা আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইতেছি। আজিকার দিনে বিশ্বের জাতিসমূহ কোন পথ বাছিয়া নিবে তাহা লইয়া সং পড়িয়াছে। এই পথ বাছিয়া নেওয়ার বিবেচনার উপর নির্ভর করিবে আমরা সামগ্রিক ধ্বংসের ভীতি এবং আণবিক যুদ্ধের হুমকি নিয়া এবং ক্ষুধা,

 

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘে প্রথম বাংলা বজবন্ধুর এতিহাসিক ভাষণ
২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘে প্রথম বাংলা বজবন্ধুর এতিহাসিক ভাষণ

 

বেকার ও দারিদ্রের কষাঘাতে মানবিক দুর্গতিকে বিপুলভাবে বাড়াইয়া তুলিয়া আগাইয়া যাইব অথবা আমরা এমন এক বিশ্ব গড়িয়া তোলার পথে আগাইয়া যাইব- যে বিশ্বে মানুষের সৃজনশীলতা এবং আমাদের সময়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতি আণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত উজ্্বলতার ভবিষ্যতের রূপায়ন সম্ভব করিয়া তুলিবে এবং যে বিশ্ব কারিগরি বিদ্যা ও সম্পদের পারস্পারিক অংশীদারিত্র মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে সুন্দর জীবন গড়িয়া তোলার অবস্থা সৃষ্টি করিবে। যে অর্থনৈতিক উত্তেজনা সম্প্রতি সমগ্র বিশ্বকে নাড়া দিয়াছে, তাহা একটি ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিয়া জরুরীভাবে মোকাবিলা করিতে হইবে।

এই বৎসরের প্রথম দিকে এই পরিষদের বিশেষ অধিবেশন বর্তমান জটিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করিয়াছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বাংলাদেশকে মারাকতুকভাবে আঘাত হানিয়াছে। যুদ্ধেও ধ্বংসলীলার উপর সৃষ্ট বাংলাদেশ পরপর কতিপয় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হইয়াছে । আমরা সর্বশেষে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হইয়াছি, তাহা হইতেছে এই বৎসরের নজিরবিহীন বন্যা । এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সাহায্য করার ব্যাপারে সক্রিয় উৎসাহ প্রদর্শন করায় আমরা জাতিসংঘ, তার বিভিন্ন সংস্থা ও মহাসচিবের কাছে কৃতজ্ঞ।

আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেদীন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী বুতেফ্লিকা বাংলাদেশের সাহায্যে আগাইয়া আসার জন্য জোটনিরপেক্ষ দেশসমুহের প্রতি আহবান জানাইয়াছেন। মিত্রদেশগুলি এবং বিশ্বের মানবিক সংস্থাসমূহও এ ব্যাপারে সাড়া দিয়াছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিই শুধু ব্যাহত হয় নাই, উহার ফলে দেশে আজ দূর্ভিক্ষাবস্থার সৃষ্টি হইয়াছে। ইহা ছাড়া বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ধীতির দরুন আমাদের মতো দেশগুলিতে দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে হাজার হাজার ডলার শৃণ্যতার সৃষ্টি হইয়াছে।

ইহার অর্থ এই দাড়ায় যে বার্ষিক মাথাপিছু একশ ডলারের কম আয়ের জনগণ বর্তমানে মারাত্বক সংকটের সম্মুখীন হইয়াছে। বাধ্য হইয়াছে। বিশ্বখাদ্য সংস্থার বিবেচনায় শুধুমাত্র বাঁচিয়া থাকার জন্য যে সর্বনিম্ন সামগ্রীর প্রয়োজন, তাহার চাইতেও কম ভোগ করিয়াছে যেসব মানুষ তাহারা আজ অনাহারের মুখে পতিত হইয়াছে। দরিদ্র দেশগুলির ভবিষৎ আরো অন্ধকার। শিল্পোন্নত দেশগুলির রপ্তানী পণ্য, খাদ্য সামগ্রীর ক্রমবর্ধমান মূল্যের দরুন তাহা আজ ক্রমশ তাহাদের নাগালের বাহিরে চলিয়া যাইতেছে ।

খাদ্য উৎপাদনে স্বয়সম্পুর্ণতা অর্জনের জন্য তাহাদের প্রচেষ্টা ও প্রয়োজনীয় উৎপাদনের সহায়ক সামগ্রীর ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি ও দুষ্প্রাপ্যতার ফলে প্রচন্ভভাবে বিঘ্নিত হইতেছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতীর ফলে ইতিমধ্যেই দারিদ্র ও ব্যাপক বেকারীর নিম্পেষণে পতিত দেশগুলি তাহদের পাছ হইতে ছয় শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধির হার সম্বলিত পরিমিত উন্নয়ন পরিকল্পনা ছাটাই করার ভয়ানক আশংকার হুমকিতে পতিত হইয়াছে।

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ । বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষণ
২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ । বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষণ

এইমুদ্রাস্ফীতীর  ফলে কেবলমাত্র উন্নয়ন প্রকল্পে খরচই বহুগুণ তাহাদের সামর্থ্যও প্রতিকুলভাবে কমিয়া গিয়াছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য বিশ্বের জাতিসমূহ এঁক্যবদ্ধভাবে কার্যক্রম গ্রহণ করিতে না পারিলে মানুষের দুঃখ দুর্দশা আরো চরমে উঠিবে। ইতিহাসে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়। মানুষের সেই দুঃখ দুর্দশার আর কোন পূর্ববর্তী নজীর পাওয়া যাইবে না। ইহার পাশাপাশি অবশ্য থাকিবে গুটিকয়েক লোকের অপ্রত্যাশিত সুখ-সমৃদ্ধি।

শুধুমাত্র মানবিক সংহতি ও ভ্রাতৃতুবোধ গড়িয়া তোলা এবং পারস্পারিক স্বনির্ভরতার স্বীকৃতি, এই পরিস্থিতির যুক্তিযুক্ত সমাধান আনিতে পারে এবং এই মহাবিপর্যয় পরিহার করিবার জন্য জরুরী ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যাবশ্যক । একটি যথার্থ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়িয়া তোলার পদক্ষেপ নিতে জাতিসংঘকে এর আগে কোথাও এই ধরণের চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করিতে হয় নাই।

এই ধরণের ব্যবস্থায় শুধুমাত্র নিজ নিজ প্রাকৃতিক ইহাতে একটি স্থায়ী এবং যথার্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য বিশ্বের দেশগুলির সাধারণ স্বার্থের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক কাঠামো প্রণয়নের ব্যবস্থা থাকিতে হইবে। এই মুহুর্তে আমরা প্রত্যেক মানুষের জন্য মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক ঘোষণায় স্বীকৃত মুক্তভাবে অর্থনৈতিক সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সুবিধা ভোগের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক দায়িত্বের কথা দাস্তহিনভাবে পুররুন্লেখ করিতেছি।

আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুযায়ী প্রত্যেকটি মানুষের স্বাস্থ্য এবং পরিবারের কল্যাণের জন্য পর্যাপ্ত জীবনযাত্রার ব্যবস্থা নিশ্চিত করিতে হইবে । আমরা এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ সচেতন যে, বর্তমান অর্থনৈতিক সঙ্কট শুধুমাত্র শান্তি এবং আন্তর্জাতিক সমঝোতার পরিবেশে সমাধান করা সম্ভব৷ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বর্তমান অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করার জরুরী ব্যবস্থা নিতে হইবে

। ইহাতে শুধুমাত্র এই ধরণের পরিবেশ সৃষ্টি হইবে না, ইহাতে: অস্ত্রসজ্জার জন্য যে বিপুল সম্পদ অপচয় হইতেছে, তাহাও মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত করা যাইবে । বাংলাদেশ প্রথম হইতেই শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান ও সকলের প্রতি বন্ধুত্ব – এই নীতিমালার উপর ভিত্তি করিয়া জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করিয়াছে।

কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশই কষ্টলব্ধ জাতীয় স্বাধীনতার ফল ভোগ করিতে আমাদেরকে সক্ষম করিয়া তুলিবে এবং সক্ষম করিয়া তুলিবে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করিবার জন্য আমাদের সকল শক্তি ও সম্পদের সমাবেশ ও কেন্দ্রীভূত করিতে । এই ধারণা হইতে জন্ম নিয়াছে শান্তির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রতি।

এই জন্য সমঝোতার অগ্রগতি, উত্তেজনা প্রশমন, অস্ত্র সীমিতকরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান নীতির সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকাসহ-বিশ্বের যে কোন অংশে যে কোন প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হউক না কেন, আমরা তাহাকে স্বাগত জানাই । এই নীতির প্রতি অবিচল থাকিয়া আমরা ভারত মহাসাগরীয় এলাকা সম্পর্কে শান্তি এলাকার ধারণা, যাহা এই পরিষদ অনুমোদন করিয়াছে, তাহাকে সমর্থন করি।

আমরা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াকে শান্তি, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ এলাকায় পরিণত করার প্রতিও সমর্থন জানাই । আমরা বিশ্বাস করি যে, সমবেত উন্নয়নশীল দেশসমূহ শান্তির স্বার্থকে দৃঢ় সমর্থন করে। জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা ও শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিপুল সংখ্যাগুরু জনগণের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা তাহারা প্রকাশ করিয়াছেন। মানবজাতির অস্তিত্ রক্ষার জন্য শান্তি অত্যন্ত জরুরী এবং তাহা সমগ্র বিশ্বের নর-নারীর গভীর আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটাইবে এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠিত শান্তিই দীর্ঘস্থায়ী হইতে পারে।

বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অঙ্গীকার প্রমাণের জন্য উপমহাদেশে আপোষ মীমাংসার পদ্ধতিকে আমরা জোরদার করেছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের অভ্যুদয় বস্ততপক্ষে এই উপমহাদেশে শান্তি কাঠামো এবং স্থায়িত্‌ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অবদান সৃষ্টি করিবে। ইহা ছাড়া আমাদের জনগণের মঙ্গলের স্বার্থেই অতীতের সংঘর্ষ ও বিরোধিতার পরিবর্তে মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে । আমরা আমাদের নিকটতম

 

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘে প্রথম বাংলা বজবন্ধুর এতিহাসিক ভাষণ
২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালের জাতিসংঘে প্রথম বাংলা বজবন্ধুর এতিহাসিক ভাষণ

 

প্রতিবেশী ভারত ও নেপালের সাথে শুধুমাত্র সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কই প্রতিষ্ঠা করি নাই, অতীতের সমস্ত গ্রানি ভুলিয়া গিয়া পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক করিয়া নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করিয়াছি। পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য আমরা কোন উদ্যোগ বাদ দেই নাই এবং সবশেষে ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীকে ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া আমরা চুড়ান্ত অবদান রাখিয়াছি। এ সকল যুদ্ধবন্দী মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসহ মারাত্বক অপরাধ করিয়াছে।

ইহা হইতেছে নতুন অধ্যায়ের সূচনা ও উপমহাদেশে ভবিষৎ শান্তি ও স্থায়িত্‌ গড়িয়া তোলার পথে আমাদের অবদান । এই কাজ করিতে গিয়া আমরা কোন পূর্বশর্ত আরোপ অথবা কোন দরকষাকষি করি নাই। আমরা কেবলমাত্র আমাদের জনগণের ভবিষৎ মঙ্গলের কল্পনায় প্রভাবিত হইয়াছি। ৬৩ হাজার পাকিস্তানী পরিবারের অবস্থা এখানে মানবিক সমস্যারপে রহিয়া গিয়াছে। তাহারা পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করিয়াছে এবং তালিকাভূক্ত করিয়াছে।

যে দেশের প্রতি তাহারা আনুগত্য ঘোষণা করিয়াছে, সেই দেশে তাহাদের যাইবার অধিকার আছে। আইন ওআন্তরজাতিক  চুক্তি অনুসারে এই অধিকার তাহাদের উপর বর্তায়াছে। এই মানবিক সমস্যার অবিলম্বে সমাধান প্রয়োজন । আরো একটি জরুরী সমস্যা হইল সারা পাকিস্তানের পনি সম্পদ বন্টন। পুনরায় বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত রহিয়াছে।

আমরা আশা করি, উপমহাদেশের জনগণের কল্যাণের স্বার্থে পারস্পারিক সমঝোতার ভিত্তিতে এইসব অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান হইবে, যাহাতে স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া সফল হইতে পারে। শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান, সার্বভৌমতৃ ও আঞ্চলিক অখণুতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যের অভ্যন্তরীন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিবেশী সকল দেশের সাথে সতপ্রতিবেশশম্সপর সম্পর্ক রাখিবে।

আমাদের অঞ্চলে এবং বিশ্বশান্তির অন্বেষার সকল উদ্যোগের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকিবে । জাতিসংঘ অসুবিধা ও বাধাবিদ্ন সত্তেও তাহার ২৫ বৎসর কার্ষকালে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মানবিক অগ্রগতির লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখিয়াছে। এক কথায় বলা যায়, বিরোধ ও মানবিক দুঃখ দুর্দশা সত্তেও জাতিসংঘ ভাবীকালের দিকে

মানুষের আশা-আকাত্থাকে সমুজ্জল রাখিয়াছে। বিশ্ব সংস্থার সুনির্দিষ্ট সাফল্য ও সম্ভাবনাময় দিক সম্পর্কে বাংলাদেশ যেরূপ উপলব্ধি করিয়াছে এমনটি আর .কেউ করে নাই । ড. কুর্ট ওয়ান্ডহেইমের সম্ভাবনাময় নেতৃত্‌ এবং তার নিবেদিতপ্রাণ সহকর্মীদের জন্য । বাংলাদেশে যুদ্ধের দাগ এবং ভারত হইতে ফিরিয়া আসা এক কোটি শরণার্থীকে পুণর্বাসিত করিতে জাতিসংঘ আমাদের দেশে ব্যাপক সাহায্য ও পুনর্গঠন কর্মসূচী গ্রহণ করিয়াছিল।

এইসব শরণার্থী মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নিয়াছিল। জাতিসংঘের মহাসচিব, তার সহকর্মী এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থা যাহারা আমাদের দেশে বিরাট কর্মসূচীতে অংশ নিয়াছিল, তাহাদেরকে বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণের পক্ষ হইতে কৃতজ্ঞতা জানাইতেছি। আমরা বিশ্বাস করি জাতিসংঘের গঠনমূলক নেতৃত্‌ উপমহাদেশের অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে সহায়ক হইবে।

আমি আগেই বলিয়াছি, সাম্প্রতিক বিপর্যয়কারী বন্যায় ক্ষতিথরস্তদের সাহায্য সংগ্রহের ব্যাপারে জাতিসংঘের প্রয়াসে আমরা কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশ বার বার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়িয়াছে। বাংলাদেশ বিশেষ অসুবিধার জন্য এমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারে নাই, যাহার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এ ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাইয়া আসিতে পারে ।

জাতিসংঘ দুর্যোগ ত্রাণ সমন্বয় অফিস স্থাপন করিয়াছে। এই ব্যাপারে স্বল্প হইলেও একটি দৃষ্টান্ত সূচনা করিয়াছে। লক্ষ্য পূরণে উদ্যোগ সমশ্িত করার ব্যাপারে তাই জাতিসংঘের সদস্যদের একটি বিশেষ দায়িত্‌ রহিয়াছে। অসম্ভবকে জয় করার ক্ষমতা এবং অজেরকে জয় করার শক্তির প্রতি অকৃষ্ঠ বিশ্বাস রাখিয়া আমি আমার বক্তৃতা শেষ করিতে চাই। আমাদের মতো যেইসব দেশ সংগ্রাম ও আত্ুদানের মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে, এই বিশ্বাস তাহাদের দৃঢ় ।

আমরা দুঃখ ভোগ করিতে পারি কিন্ত মরিব না। টিকিয়া থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করিতে জনগণের দৃঢ়তাই চরম শক্তি । আমাদের লক্ষ্য স্বনির্ভরতা । আমাদের পথ হইতেছে জনগণের পক্যবদ্ধ ও যৌথ প্রচেষ্টা। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সম্পদ ও প্রযুক্তি বিদ্যার ব্যবহার মানুষের দুঃখ দুর্দশা হ্রাস করিবে এবং আমাদের কর্মকাণ্ডকেও সহজতর করিবে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই।

নতুন বিশ্বের অভ্যুদয় ঘটিতেছে। আমাদের নিজেদের শক্তির উপর আমাদের বিশ্বাস রাখিতে হইবে । আর লক্ষ্য পূরণ এবং সুন্দর ভাবীকালের জন্য আমাদের নিজেদেরকে গড়িয়া তুলিবার জন্য জনগণের এক্যবদ্ধ ও সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই আমরা আগাইয়া যাইব ।

Bangabandhu Gurukul

 

আরও পরুন :

 

 

“২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ । বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক জাতিসংঘে প্রথম বাংলা ভাষণ”-এ 3-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন